মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিনের উত্তেজনা, সামরিক সংঘাত ও কূটনৈতিক অচলাবস্থার প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বহুল আলোচিত “ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক”-এর পূর্ণাঙ্গ ১৪ দফা প্রকাশ করেছে হোয়াইট হাউস। প্রকাশিত নথি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ডিজিটালভাবে এই সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেছেন এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে এটি অনুমোদন করেছেন। এই উদ্যোগকে দুই দেশের মধ্যে সম্ভাব্য একটি ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তির ভিত্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সমঝোতার প্রথম ধারায় যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং তাদের সংশ্লিষ্ট মিত্রদের সব ধরনের সামরিক অভিযান অবিলম্বে ও স্থায়ীভাবে বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে শক্তি প্রয়োগ বা যুদ্ধের হুমকি থেকে বিরত থাকার নীতিতেও উভয় পক্ষ সম্মত হয়েছে। দ্বিতীয় ধারায় পারস্পরিক সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা এবং অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতিকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী সর্বোচ্চ ৬০ দিনের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ ও চূড়ান্ত শান্তি চুক্তি সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে এবং প্রয়োজনে সময়সীমা বাড়ানোর সুযোগ রাখা হয়েছে।
অর্থনৈতিক ও সামুদ্রিক ব্যবস্থায়ও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। সমঝোতা কার্যকর হলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে আরোপিত নৌ অবরোধ ও সামুদ্রিক সীমাবদ্ধতা ধাপে ধাপে প্রত্যাহার করবে এবং ৩০ দিনের মধ্যে তা সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সময়ে ইরান যুদ্ধ-পূর্ব পর্যায়ে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল পুনরুদ্ধার করবে। হরমুজ প্রণালী এবং সংশ্লিষ্ট সামুদ্রিক রুটে নিরাপদ বাণিজ্যিক চলাচল নিশ্চিত করা এবং অতিরিক্ত ফি আরোপ না করার বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। পাশাপাশি ৩০ দিনের মধ্যে মাইন অপসারণ ও চলাচল বাধামুক্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
সবচেয়ে আলোচিত অংশগুলোর একটি হলো ইরানের পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ পরিকল্পনা। এছাড়া ইরানের বিরুদ্ধে আরোপিত আন্তর্জাতিক ও একতরফা নিষেধাজ্ঞা ধাপে ধাপে প্রত্যাহার, তেল রপ্তানিতে বিশেষ সুবিধা, ব্যাংকিং ও আর্থিক কার্যক্রমে শিথিলতা এবং বিদেশে আটকে থাকা ইরানি সম্পদ অবমুক্ত করার নীতিগত সম্মতিও উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ইরান পুনরায় ঘোষণা করেছে যে তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বা অর্জনের পথে যাবে না এবং ভবিষ্যৎ পারমাণবিক কর্মসূচি আন্তর্জাতিক তদারকির আওতায় পরিচালিত হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ১৪ দফা বাস্তবায়িত হলে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি, জ্বালানি সরবরাহ, বৈশ্বিক বাণিজ্য ও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এটি এখনো চূড়ান্ত শান্তি চুক্তি নয়; আগামী ৬০ দিনের আলোচনা ও বাস্তবায়ন অগ্রগতিই নির্ধারণ করবে এই উদ্যোগ বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়।