ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় চলমান যুদ্ধ ও অবরোধের কারণে মানবিক সংকট ক্রমেই ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, চিকিৎসা, আশ্রয় ও মৌলিক সেবার তীব্র সংকটে লাখো বাস্তুচ্যুত মানুষের জীবন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা ও আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা প্রতিষ্ঠানগুলো সতর্ক করে জানিয়েছে, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে পরিস্থিতি আরও মারাত্মক হয়ে উঠতে পারে। আশ্রয়কেন্দ্র ও অস্থায়ী শিবিরগুলোতে অতিরিক্ত মানুষের চাপের কারণে ন্যূনতম জীবনযাত্রার পরিবেশও নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। অনেক পরিবার একাধিকবার বাস্তুচ্যুত হয়ে খোলা আকাশের নিচে কিংবা অস্থায়ী তাঁবুতে বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে খাদ্য সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ায় বহু পরিবার দিনে একবারও পর্যাপ্ত খাবার পাচ্ছে না। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে অপুষ্টির হার দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং অপুষ্টিজনিত জটিলতায় হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। দীর্ঘস্থায়ী খাদ্য সংকটের কারণে গাজার কিছু এলাকায় দুর্ভিক্ষসদৃশ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। অনেক মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা খাদ্য সংগ্রহের লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও পর্যাপ্ত সহায়তা না পেয়ে খালি হাতে ফিরে যাচ্ছেন। বাধ্য হয়ে অনেকে অস্বাস্থ্যকর ও ঝুঁকিপূর্ণ খাদ্যের ওপর নির্ভর করছেন, যা নতুন স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে।
পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে গ্রীষ্মের তীব্র তাপদাহ। অস্থায়ী তাঁবুতে বসবাসকারী লাখো মানুষের জন্য পর্যাপ্ত ছায়া, বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা না থাকায় পানিশূন্যতা, ডায়রিয়া, ত্বকের রোগ এবং শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। শিশু, নারী ও বয়স্করা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। একই সঙ্গে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রায় সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ায় বিভিন্ন এলাকায় ময়লা-আবর্জনা জমে ইঁদুর ও কীটপতঙ্গের উপদ্রব বেড়েছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে সংক্রামক রোগ মহামারির আকার ধারণ করতে পারে।
অন্যদিকে, গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থাও চরম সংকটে রয়েছে। অনেক হাসপাতাল আংশিকভাবে চালু থাকলেও ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ঘাটতির কারণে পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাসেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। প্রতিদিন আহত ও অসুস্থ মানুষের সংখ্যা বাড়লেও চিকিৎসা সক্ষমতা ধারাবাহিকভাবে কমে যাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি, নিরাপদ মানবিক করিডোর এবং পর্যাপ্ত খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, ওষুধ ও জরুরি সহায়তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ না করা হলে গাজার মানবিক বিপর্যয় আরও গভীর হবে এবং এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে পুরো অঞ্চলের জন্য গুরুতর সংকট সৃষ্টি করতে পারে।
তথ্যসূত্র: জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয় দপ্তর।
