ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত নতুন সরকারের প্রথম ১০০ দিনের কার্যক্রম নিয়ে প্রকাশিত ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন দেশের আইনশৃঙ্খলা, সুশাসন ও জবাবদিহিতা পরিস্থিতি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্ন সামনে এনেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই সময়ে দেশে ৬০৫টি হত্যাকাণ্ড, ২০৯টি নারী ও শিশু ধর্ষণ, ১৯৬টি অপহরণ, ২৯৪টি ছিনতাই, ৯০টি ডাকাতি এবং পুলিশের ওপর ১২৯টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায় যে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখনও সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে। জনগণ নির্বাচনের পর একটি স্থিতিশীল, জবাবদিহিমূলক ও দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনের প্রত্যাশা করেছিল, কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা সেই প্রত্যাশার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার বিভিন্ন পদে দলীয় বিবেচনায় প্রশাসক নিয়োগের সমালোচনা করা হয়েছে। বিশেষ করে সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগকে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হয়েছে। একই সঙ্গে পুলিশ, প্রশাসন, ব্যাংক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে দলীয় প্রভাবের অভিযোগও উদ্বেগের কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো যদি নিরপেক্ষতা হারায়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে সুশাসন প্রতিষ্ঠা কঠিন হয়ে পড়ে।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ঋণের চাপ, দুর্বল ব্যাংকিং ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট এবং কর্মসংস্থান সংশ্লিষ্ট অনিশ্চয়তা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় চাপ সৃষ্টি করছে। টিআইবির মতে, সরকার এসব সমস্যা মোকাবিলায় কিছু উদ্যোগ নিলেও কাঙ্ক্ষিত ফল এখনো দৃশ্যমান নয়। পাশাপাশি দুর্নীতি দমন কমিশন, মানবাধিকার কমিশন এবং তথ্য কমিশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে কার্যকর নেতৃত্ব নিয়োগে ধীরগতি ভবিষ্যতের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
তবে প্রতিবেদনে সরকারের কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপও স্বীকৃতি পেয়েছে। শুল্কমুক্ত গাড়ি ও সরকারি প্লট সুবিধা গ্রহণ না করা, রাষ্ট্রীয় প্রটোকল পরিহার, মন্ত্রীদের কর্মমূল্যায়নের ঘোষণা এবং প্রশাসনিক নজরদারি বৃদ্ধির উদ্যোগকে সদিচ্ছার প্রতিফলন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া অন্তর্বর্তী সময়ের বেশ কিছু অধ্যাদেশকে আইনি কাঠামোর মধ্যে আনার প্রচেষ্টাও ইতিবাচক হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
সামগ্রিকভাবে মূল্যায়ন করলে দেখা যায়, সরকারের প্রথম ১০০ দিনে সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতা—দুই চিত্রই একসঙ্গে বিদ্যমান। জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে হলে শুধু প্রতীকী পদক্ষেপ নয়, বরং আইনশৃঙ্খলা উন্নয়ন, দুর্নীতি দমন, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিশ্চিতকরণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে কার্যকর সুশাসন প্রতিষ্ঠায় আরও দৃশ্যমান ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন।
