বাংলাদেশের বহুল আলোচিত শিল্পগোষ্ঠী এস আলম গ্রুপকে ঘিরে অর্থপাচার, ঋণ জালিয়াতি ও বিদেশে সম্পদ গোপনের অভিযোগ এবার আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও বড় মাত্রা পেয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের আবেদনের ভিত্তিতে সাইপ্রাসের একটি আদালত এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলম ও তার পরিবারের সম্পদের ওপর জব্দাদেশ জারি করেছে বলে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এই ঘটনায় বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত, বৈদেশিক অর্থপাচার এবং বিদেশে গোপন সম্পদ স্থানান্তরের বহু পুরোনো বিতর্ক আবারও নতুনভাবে সামনে এসেছে।
সাইপ্রাসভিত্তিক সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, নিকোসিয়া জেলা আদালত এস আলম ও তার স্ত্রীর মালিকানাধীন সম্পদ জব্দের নির্দেশ দেয়। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে পাঠানো পারস্পরিক আইনি সহায়তার আবেদনের ভিত্তিতে সাইপ্রাসের অর্থপাচারবিরোধী সংস্থা আদালতে আবেদন করলে আদালত সম্পদ জব্দের এই নির্দেশ অনুমোদন করে। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ধারণা, বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া বিপুল অর্থ সাইপ্রাস, সিঙ্গাপুর এবং বিভিন্ন অফশোর প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিদেশে স্থানান্তর করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর পূর্বে দাবি করেছিলেন, এস আলম গ্রুপের মাধ্যমে প্রায় আট বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হয়ে থাকতে পারে। তদন্তকারীদের মতে, দেশের কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে নেয়া বিপুল ঋণের অর্থ বিভিন্ন বেনামি প্রতিষ্ঠান, অফশোর কোম্পানি এবং বিদেশি বিনিয়োগ কাঠামোর মাধ্যমে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ইসলামী ব্যাংকসহ কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ বিতরণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন উঠছিল।
অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে আরও উঠে এসেছে, এস আলম ও তার পরিবারের সদস্যরা সাইপ্রাসের বিতর্কিত বিনিয়োগভিত্তিক নাগরিকত্ব কর্মসূচির মাধ্যমে দেশটির নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছিলেন। পরে পরিবারটির সদস্যদের বিদেশি নাগরিকত্ব ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আর্থিক সম্পর্ক নিয়েও নতুন তথ্য সামনে আসে। একই সঙ্গে সাইপ্রাস, সিঙ্গাপুর ও বিভিন্ন দ্বীপভিত্তিক অঞ্চলে থাকা একাধিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততার অভিযোগও তদন্তে যুক্ত হয়েছে।
বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং অন্যান্য তদন্ত সংস্থা বর্তমানে দেশে ও বিদেশে থাকা সম্পদ, ব্যাংক হিসাব এবং বিনিয়োগ খতিয়ে দেখছে। আদালত ইতোমধ্যে বিদেশে থাকা কিছু হিসাব ও সম্পদ জব্দের নির্দেশ দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, সাইপ্রাসের আদালতের এই সিদ্ধান্ত শুধু একটি ব্যবসায়ী পরিবারের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নয়; বরং এটি আন্তর্জাতিক অর্থপাচার ও অফশোর সম্পদ গোপনের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক নজরদারির অংশ। এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ও সম্পদ আদৌ দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে কি না এবং এই তদন্ত বাংলাদেশের আর্থিক খাতের জবাবদিহি কতটা নিশ্চিত করতে পারবে।
