বিদেশি প্রযুক্তি শুধু আমদানি করে ব্যবহার নয়, বরং তা নিজেদের প্রয়োজন, পরিবেশ ও বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে উন্নত করার পথে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে ইন্দোনেশিয়া। রাশিয়ার তৈরি একটি দ্রুতগতির জাহাজের নকশা পরিবর্তন করে দেশটির জলসীমার উপযোগী করার উদ্যোগকে প্রযুক্তিগত স্বনির্ভরতার নতুন মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই প্রকল্পের নেতৃত্ব দিচ্ছে ইন্দোনেশিয়ার শীর্ষ প্রযুক্তি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সেপুলুহ নোপেম্বার প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটির রেক্টর অধ্যাপক বামবাং প্রামুজাতি জানান, রাশিয়া থেকে প্রাপ্ত দ্রুতগতির জাহাজের মূল নকশা ইন্দোনেশিয়ার সমুদ্রের ঢেউ, আবহাওয়া, উপকূলীয় পরিবেশ ও জলপথের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সে কারণে দেশীয় প্রকৌশলীরা জাহাজটির কাঠামো ও নকশা পুনর্গঠন করে স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিচ্ছেন।
বামবাং প্রামুজাতির মতে, ইন্দোনেশিয়া আর শুধু বিদেশি প্রযুক্তির বাজার হয়ে থাকতে চায় না; বরং প্রযুক্তি আয়ত্ত করে নিজস্ব সক্ষমতা গড়ে তোলাই এই সহযোগিতার প্রধান লক্ষ্য। প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের দাবি, পুনর্নকশাকৃত অ্যালুমিনিয়াম নির্মিত দ্রুতগতির জাহাজগুলো প্রচলিত নৌযানের তুলনায় প্রায় ৪ গুণ বেশি গতিতে চলতে সক্ষম হবে। ইতোমধ্যে পরিচালিত সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে আশাব্যঞ্জক ফল পাওয়া গেছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, জাহাজগুলো দেশীয় শিল্পের মাধ্যমে উৎপাদন করা হবে এবং পূর্ব জাভার মাদুরা অঞ্চলের একটি জাহাজ নির্মাণ কেন্দ্রে নির্মাণকাজ সম্পন্ন হবে। এর ফলে শুধু প্রযুক্তি স্থানান্তর নয়, স্থানীয় শিল্পের বিকাশ, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি এবং দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতাও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।
এই উদ্যোগটি পূর্ব জাভা প্রদেশ ও রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গ শহরের মধ্যে প্রযুক্তিগত সহযোগিতার অংশ। এর মূল উদ্দেশ্য বিদেশি প্রযুক্তির ওপর দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় উদ্ভাবন ও উৎপাদন সক্ষমতা শক্তিশালী করা। প্রকল্পের আওতায় জাহাজ নির্মাণের পাশাপাশি প্রযুক্তি স্থানান্তর, কারিগরি প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল প্রযুক্তি, সাইবার নিরাপত্তা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সক্ষমতা উন্নয়নেও সহযোগিতা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
বিশ্বের বৃহত্তম দ্বীপ রাষ্ট্রগুলোর অন্যতম ইন্দোনেশিয়ায় ১৭ হাজারেরও বেশি দ্বীপ রয়েছে। ফলে দ্রুত, নিরাপদ ও কার্যকর সামুদ্রিক যোগাযোগ দেশটির অর্থনীতি, বাণিজ্য এবং সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, স্থানীয় সমুদ্র পরিস্থিতির উপযোগী দ্রুতগতির জাহাজ তৈরি করা গেলে আন্তঃদ্বীপ যোগাযোগে বড় পরিবর্তন আসবে এবং জাতীয় অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে। একই সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে মস্কো ও জাকার্তার মধ্যে যৌথ জাহাজ নির্মাণ, বন্দর উন্নয়ন, সামুদ্রিক সরবরাহ ব্যবস্থা এবং প্রযুক্তি স্থানান্তর নিয়ে সহযোগিতা আরও গভীর হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, বিদেশি প্রযুক্তিকে সরাসরি ব্যবহার না করে স্থানীয় চাহিদা অনুযায়ী পরিবর্তন, উন্নয়ন এবং দেশীয় শিল্পের মাধ্যমে উৎপাদনের এই মডেল উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রযুক্তিগত স্বাধীনতা, শিল্প সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বনির্ভরতার একটি কার্যকর উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে।
