দেশের বিদ্যুৎ খাতে আবারও চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং এর সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও অর্থনৈতিক কার্যক্রমে। তীব্র গরম, কৃষিখাতে সেচ কার্যক্রম বৃদ্ধি এবং শিল্প খাতের উচ্চ বিদ্যুৎ চাহিদার কারণে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুতের প্রয়োজনীয়তা দ্রুত বেড়েছে। একই সময়ে কয়েকটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে না পারায় সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ব্যবধান তৈরি হয়েছে। এর ফলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নির্ধারিত ও অনির্ধারিত উভয় ধরনের লোডশেডিং বাড়ানো হয়েছে। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকার বাইরে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের মাত্রা বেশি হওয়ায় জনজীবন, ব্যবসা ও কৃষি কার্যক্রমে চাপ তৈরি হচ্ছে।
বিদ্যুৎ বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, চলতি গ্রীষ্ম মৌসুমে দেশের বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ১৭ হাজার মেগাওয়াট অতিক্রম করেছে। মে মাসে জাতীয় গ্রিডে সর্বোচ্চ ১৭,২০১ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের রেকর্ড তৈরি হলেও বাস্তবে সব সময় সেই পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না। এর প্রধান কারণ জ্বালানি সরবরাহ সীমাবদ্ধতা, দেশীয় গ্যাসের ঘাটতি এবং কয়েকটি উৎপাদন ইউনিটের রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম। ফলে কাগজে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বেশি থাকলেও বাস্তব সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। বিশেষ করে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পর্যাপ্ত জ্বালানি না পাওয়ায় তাদের উৎপাদন কমে যাচ্ছে এবং পুরো ব্যবস্থায় চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সংকটের পেছনে একাধিক কাঠামোগত কারণ একসঙ্গে কাজ করছে। দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে সরবরাহ কমে যাওয়া, আমদানিকৃত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের উচ্চ ব্যয়, কিছু বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রের আংশিক উৎপাদন, তীব্র গরমে আবাসিক পর্যায়ে অতিরিক্ত ব্যবহার এবং সেচ মৌসুমে কৃষি খাতের বাড়তি চাহিদা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এসব কারণে জাতীয় গ্রিডে ঘাটতি তৈরি হলে প্রথম ধাক্কা সাধারণত জেলা ও গ্রামীণ এলাকায় পড়ে। ইতোমধ্যে রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন অঞ্চলে একাধিক দফায় লোডশেডিংয়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে। অন্যদিকে রাজধানী ঢাকায় গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, সরকারি কার্যক্রম ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম সচল রাখতে তুলনামূলকভাবে কম লোডশেডিং করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে আগামী কয়েক সপ্তাহেও বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর চাপ অব্যাহত থাকতে পারে। তবে বিদ্যুৎ বিভাগ জানিয়েছে, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি বৃদ্ধি, গ্যাস সরবরাহ সমন্বয় এবং বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন বাড়ানোর মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় জ্বালানি উৎসের বৈচিত্র্য, উৎপাদন দক্ষতা বৃদ্ধি এবং সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়নকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
