মিয়ানমারের সামরিক সরকার সম্প্রতি দাবি করেছে যে দেশটির অফশোর অঞ্চলে চারটি নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়েছে, যেখানে মোট প্রায় ১০৯ ট্রিলিয়ন ঘনফুট প্রাকৃতিক গ্যাস মজুদের সম্ভাবনা রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ক্ষেত্রটি তানিনথারিই উপকূলের গভীর সমুদ্রাঞ্চলে অবস্থিত, যেখানে এককভাবে প্রায় ৯৫ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই আবিষ্কারের সঙ্গে আন্দামান সাগর অঞ্চলের এম-১৫ ব্লকের সম্পর্ক থাকতে পারে, যা আগের বিভিন্ন ভূতাত্ত্বিক অনুসন্ধান ও মূল্যায়নে প্রায় ৯৪.৬ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সম্ভাবনার জন্য চিহ্নিত ছিল। যদি এই বিশাল মজুদ বাস্তবিক অর্থে বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য হিসেবে প্রমাণিত হয়, তবে এটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ প্রাকৃতিক গ্যাস আবিষ্কার হিসেবে বিবেচিত হবে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
২০১৫ সালে সিঙ্গাপুর-ভিত্তিক ক্যানাডিয়ান ফরসাইট গ্রুপ নামের একটি প্রতিষ্ঠান মিয়ানমারের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল ও গ্যাস প্রতিষ্ঠান মিয়ানমার অয়েল অ্যান্ড গ্যাস এন্টারপ্রাইজের সঙ্গে উৎপাদন বণ্টন চুক্তি করে এই অঞ্চলে অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু করেছিল। পূর্ববর্তী মূল্যায়ন অনুযায়ী এম-১৫ ব্লকের সম্ভাব্য গ্যাস সম্পদের বাজারমূল্য প্রায় ২৮০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পর্যন্ত হতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছিল। বিশ্লেষকদের মতে, এত বড় গ্যাস ভাণ্ডার নিশ্চিতভাবে উত্তোলনযোগ্য হলে মিয়ানমার শুধু জ্বালানি রপ্তানিকারক দেশ হিসেবেই নয়, বরং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারবে। এতে দেশটির বৈদেশিক মুদ্রা আয় বৃদ্ধি, জ্বালানি নিরাপত্তা শক্তিশালীকরণ এবং আঞ্চলিক প্রভাব বৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি হবে।
তবে ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমারে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং নিরাপত্তা সংকটের কারণে বিশ্বের শীর্ষ জ্বালানি কোম্পানিগুলো যেমন টোটালএনার্জি, শেভরন এবং উডসাইড এনার্জি দেশটির জ্বালানি খাত থেকে সরে যায়। এর ফলে নতুন গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উন্নয়ন ও উৎপাদন কার্যক্রম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে। বর্তমান সামরিক সরকার এই আবিষ্কারের ঘোষণা দিয়ে মূলত অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের চেষ্টা করছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
অন্যদিকে ঘোষিত গ্যাস মজুদের তথ্য এখনো আন্তর্জাতিকভাবে স্বাধীন কোনো সংস্থা দ্বারা যাচাই করা হয়নি। ফলে প্রকৃত মজুদের পরিমাণ, উত্তোলনের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, পরিবেশগত ঝুঁকি এবং নিষেধাজ্ঞার প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু ভূতাত্ত্বিক সম্ভাবনা থাকলেই তা অর্থনৈতিকভাবে কার্যকর সম্পদে পরিণত হয় না; বরং বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য প্রমাণ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ নিশ্চিত হওয়া জরুরি।
যদি এই বিপুল গ্যাস মজুদ সত্যি প্রমাণিত হয়, তাহলে মিয়ানমার বঙ্গোপসাগর ও আন্দামান সাগর অঞ্চলের জ্বালানি মানচিত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে। এতে চীন, ভারত এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে জ্বালানি প্রতিযোগিতা ও কৌশলগত সমীকরণে নতুন পরিবর্তন আসতে পারে। তবে আপাতত এই ১০৯ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস আবিষ্কারের দাবি আন্তর্জাতিক যাচাই ছাড়া কেবল সম্ভাবনার পর্যায়েই রয়ে গেছে, যা ভবিষ্যতের অনুসন্ধান ও প্রমাণের ওপর নির্ভর করছে।
