চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে ৮৫০ একর জমির ওপর দেশের প্রথম প্রতিরক্ষা অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগকে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ও শিল্প উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি সম্ভাবনাময় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, দীর্ঘমেয়াদে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্য নিয়ে এই শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা হবে, যার মাধ্যমে দেশীয় প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ভবিষ্যতে রপ্তানি সম্ভাবনা সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ ও বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের যৌথ উদ্যোগে নেওয়া এই পরিকল্পনায় মিরসরাইয়ের জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের প্রায় ৮৫০ একর জমি নীতিগতভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। পূর্বে অন্য অর্থনৈতিক পরিকল্পনার আওতায় বিবেচিত এই জমিকে এখন প্রতিরক্ষা শিল্পভিত্তিক উন্নয়নের জন্য ব্যবহারের চিন্তা করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, এই উদ্যোগের লক্ষ্য শুধু রাষ্ট্রীয় কারখানার উৎপাদন বাড়ানো নয়; বরং বিদেশি প্রযুক্তি সহযোগিতা, যৌথ বিনিয়োগ, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং বেসরকারি অংশগ্রহণের মাধ্যমে একটি আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিরক্ষা শিল্পভিত্তি গড়ে তোলা। পরিকল্পনাটি ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে এবং শুরুতেই পুরো ৮৫০ একর জমি ব্যবহার করা হবে না। সম্ভাব্য উৎপাদন খাতে গোলাবারুদ, সামরিক যন্ত্রাংশ, আকাশভিত্তিক চালকবিহীন প্রযুক্তি, যোগাযোগ ব্যবস্থা, সাইবার নিরাপত্তা সফটওয়্যার এবং অন্যান্য প্রতিরক্ষা সংশ্লিষ্ট সরঞ্জামের বিষয় আলোচনা হলেও সরকার এখনো কোনো নির্দিষ্ট উৎপাদন কাঠামো বা বিদেশি অংশীদার আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেনি।
বিশ্বের সাম্প্রতিক সংঘাতগুলো দেখিয়েছে, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে শুধু উন্নত অস্ত্র নয়, বরং গোলাবারুদ, যন্ত্রাংশ ও সরবরাহ ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা একটি বড় কৌশলগত শক্তি। সেই বাস্তবতায় স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলা জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই শিল্পাঞ্চল সফল হলে ধাতু, বিদ্যুৎনির্ভর প্রযুক্তি, প্রকৌশল, গবেষণা ও সফটওয়্যারভিত্তিক নতুন শিল্প পরিবেশ তৈরি হতে পারে এবং উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়তে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রতিরক্ষা শিল্পের সঙ্গে নিরাপত্তা, প্রযুক্তি সুরক্ষা ও কঠোর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা সরাসরি যুক্ত। তাই বেসরকারি অংশগ্রহণ নিশ্চিত হলেও উৎপাদন, প্রযুক্তি ব্যবস্থাপনা, রপ্তানি ও নিরাপত্তা তদারকিতে রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে শক্তিশালী রাখা প্রয়োজন হবে। অনেক দেশেই প্রতিরক্ষা শিল্প বেসরকারি অংশগ্রহণে পরিচালিত হলেও তা কঠোর আইন ও মানদণ্ডের আওতায় পরিচালিত হয়। সব মিলিয়ে মিরসরাইয়ের এই উদ্যোগকে অনেকে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত বিনিয়োগ হিসেবে দেখছেন, যা ভবিষ্যতে দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ও শিল্পভিত্তিক অর্থনীতিকে নতুন পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে। তবে প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ কাঠামো ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনা সম্পর্কে চূড়ান্ত সরকারি ঘোষণা এখনো অপেক্ষমাণ।
