জাপানের নজরে কক্সবাজারের মহেশখালী-মাতারবাড়ি অঞ্চল এখন শুধু একটি উপকূলীয় এলাকা নয়, বরং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতি ও আঞ্চলিক বাণিজ্যের সম্ভাব্য কেন্দ্র হিসেবে নতুন গুরুত্ব পাচ্ছে। গভীর সমুদ্রবন্দর, শিল্পাঞ্চল, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামো এবং আঞ্চলিক সংযোগব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে এখানে একটি বৃহৎ অর্থনৈতিক করিডোর গড়ে তোলার পরিকল্পনা এগিয়ে চলছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি সফল হলে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।
এই উদ্যোগের কেন্দ্রবিন্দু হলো জাপান-সমর্থিত বঙ্গোপসাগর শিল্প প্রবৃদ্ধি বলয় কর্মসূচি, যার ঘোষণা বাংলাদেশ ও জাপান যৌথভাবে ২০১৪ সালে দেয়। এই পরিকল্পনার লক্ষ্য ছিল ঢাকা–চট্টগ্রাম–কক্সবাজার অঞ্চলে শিল্পায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক সংযোগ বৃদ্ধি করা। জাপানের মূল্যায়ন অনুযায়ী, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে একটি প্রাকৃতিক সংযোগকেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।
বর্তমানে বাংলাদেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রামে বড় আকারের আধুনিক কনটেইনার জাহাজ সরাসরি প্রবেশের সীমাবদ্ধতা রয়েছে, ফলে আমদানি–রপ্তানিতে অতিরিক্ত সময় ও ব্যয় তৈরি হয়। মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর চালু হলে বড় জাহাজ সরাসরি ভিড়তে পারবে এবং সরবরাহ ব্যবস্থা দ্রুত ও কার্যকর হওয়ার পাশাপাশি বাণিজ্য ব্যয়ও কমে আসবে।
জাপানি উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এই বন্দর শুধু বাংলাদেশের নয়, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, নেপাল ও ভুটানের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ পণ্য পরিবহন প্রবেশদ্বার হতে পারে। ফলে মাতারবাড়ি ভবিষ্যতে আঞ্চলিক বাণিজ্য ও যোগাযোগের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।
বিভিন্ন বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, আগামী বছরগুলোতে জাপানের সম্ভাব্য বিনিয়োগ ২৫ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি হতে পারে। এই বিনিয়োগ বন্দর ছাড়াও শিল্পাঞ্চল, বিদ্যুৎকেন্দ্র, তরলীকৃত গ্যাস অবকাঠামো, সড়ক, রেল এবং অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়নে ব্যবহৃত হতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই সুযোগ থেকে সর্বোচ্চ লাভ পেতে হলে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সক্ষমতা নিশ্চিত করা। বাস্তবায়ন সফল হলে মাতারবাড়ি শুধু একটি বন্দর নয়, বরং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরের অন্যতম প্রধান ভিত্তিতে পরিণত হতে পারে।
