বজ্রপাত প্রকৃতির এক প্রচণ্ড শক্তিশালী ও ধ্বংসাত্মক ঘটনা, যা শুধু আকাশ থেকে আলোর ঝলকানি বা শব্দের মাধ্যমে নয়, বরং মানুষের শরীর ও মানসিক অবস্থার ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে প্রায় দুই লাখ চল্লিশ হাজার মানুষ বজ্রপাতের শিকার হন, যার প্রায় দশ শতাংশ মারা যান। যারা বেঁচে থাকেন, তাদের জীবনও প্রায়শই আগের মতো থাকে না। বজ্রপাতের আঘাতের সময় কয়েক মিলিয়ন ভোল্টের বিদ্যুৎ শরীরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়, যা হৃদপিণ্ডের ছন্দকে বিঘ্নিত করে তাৎক্ষণিক হৃদরোগ বা ‘কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট’ ঘটাতে পারে। এছাড়া চামড়া ও পেশিতে মারাত্মক পোড়া সৃষ্টি হয়, যাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানে ‘লিচেনবার্গ ফিগার’ বলা হয়। বিদ্যুতের প্রবাহ স্নায়ুতন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করে দীর্ঘমেয়াদী পক্ষাঘাত, স্মৃতিশক্তি হ্রাস বা মস্তিষ্কের স্থায়ী ক্ষতির কারণ হতে পারে। তীব্র শব্দ এবং আলোর ঝলকানি মানুষের শ্রবণশক্তি ও দৃষ্টিশক্তিও প্রভাবিত করে, অনেক ক্ষেত্রে স্থায়ী অন্ধত্ব বা শ্রবণক্ষমতার ক্ষতি দেখা যায়।
আমেরিকার নর্থ ক্যারোলাইনা অঙ্গরাজ্যের বাসিন্দা গ্যারি রেনল্ডস একজন কাঠমিস্ত্রি, যিনি চারবার বজ্রপাতের শিকার হয়েছেন। প্রথমবার ২০০৭ সালে নিজের গ্যারেজে থাকা ফ্রিজ থেকে পানীয় বের করার সময় বজ্রপাতের শিকার হন। তিনি জানান, আঘাতের পর মাস ধরে শারীরিক যন্ত্রণায় বিছানা থেকে উঠতে পারেননি। শারীরিক কষ্টের পাশাপাশি মানসিক পরিবর্তনও অগ্রাহ্যযোগ্য নয়; বাইরের দৃষ্টিতে তিনি আগের মতোই থাকলেও ভেতরের মানুষ সম্পূর্ণভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। অন্য এক ব্যক্তি ম্যাট জানিয়েছেন, বজ্রপাতের কারণে তাঁর স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তিনি আর ব্যথা বা তাপমাত্রা অনুভব করতে পারেন না। আবার ক্যারোলিন নামের এক নারী বলেছেন, বজ্রপাতের পর তিনি আর ঘামতে পারেন না এবং প্রতিটি কাজের জন্য তথ্য লিখে রাখতে হয়।
যুক্তরাষ্ট্রে ২০০৬ সাল থেকে বজ্রপাতে অন্তত ৪৪৪ জন মারা গেছেন, বিশেষ করে ফ্লোরিডার মতো আর্দ্র অঞ্চলে বজ্রপাতের ঘটনা বেশি ঘটে। এই ঝুঁকি কমানোর জন্য লাইটেনিং স্ট্রাইক অ্যান্ড ইলেকট্রিক্যাল শক সারভাইভারস ইন্টারন্যাশনাল নামে একটি সংস্থা গড়ে তোলা হয়েছে, যা বজ্রপাতের শিকার ব্যক্তিদের সহায়তা করে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বজ্রপাতের হার বৃদ্ধি পাওয়ায় খোলা মাঠে, জলাশয় বা পাহাড়ি অঞ্চলে থাকা বিশেষভাবে বিপজ্জনক। জীবন রক্ষার প্রধান উপায় হল দ্রুত পাকা দালানের নিচে আশ্রয় নেওয়া এবং বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম থেকে দূরে থাকা। সচেতনতা, প্রস্তুতি এবং সঠিক তথ্যই বজ্রপাতের প্রভাব থেকে বাঁচতে পারে এবং অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু বা স্থায়ী ক্ষতি প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে।
