বাংলাদেশে ঈদুল আজহা শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং দেশের অন্যতম বৃহৎ মৌসুমি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে পরিণত হয়েছে। ২০২৬ সালে কুরবানীকে ঘিরে প্রায় এক লাখ কোটি টাকার বিশাল অর্থনৈতিক প্রবাহ সৃষ্টি হয়েছে বলে ধারণা করছেন অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্ট খাতের বিশ্লেষকরা। প্রাণিসম্পদ, পরিবহন, চামড়া শিল্প, খুচরা ব্যবসা, অনলাইন হাট, মোবাইল লেনদেন এবং গ্রামীণ কর্মসংস্থান—সব মিলিয়ে কুরবানীর অর্থনীতি এখন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজার ব্যবস্থার একটি শক্তিশালী চালিকাশক্তি। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এবারের কুরবানীর জন্য দেশে প্রায় এক কোটি বিশ লাখেরও বেশি গবাদিপশু প্রস্তুত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়া। গত এক দশকে দেশীয় খামারভিত্তিক পশু উৎপাদনের ব্যাপক উন্নয়নের ফলে বাংলাদেশ এখন কুরবানীর পশুতে প্রায় সম্পূর্ণ স্বনির্ভর। একসময় পার্শ্ববর্তী দেশের পশুর ওপর নির্ভরশীলতা থাকলেও বর্তমানে দেশের খামারিরাই বাজারের প্রধান চাহিদা পূরণ করছেন। এতে গ্রামীণ অর্থনীতিতে নগদ অর্থের প্রবাহ বেড়েছে এবং স্থানীয় উৎপাদকদের আর্থিক সক্ষমতা শক্তিশালী হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, কুরবানীর বাজারে পশু বিক্রির মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা সরাসরি গ্রামের মানুষের হাতে পৌঁছে যাচ্ছে, যা কৃষক পরিবারের শিক্ষা, চিকিৎসা, সঞ্চয় ও নতুন বিনিয়োগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বর্তমানে প্রায় সতেরো লাখ খামারি এবং প্রায় এক কোটি মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই মৌসুমি অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত। পশুখাদ্য উৎপাদক, ঘাস চাষি, পরিবহন শ্রমিক, ট্রাক মালিক, হাট ইজারাদার, কসাই, চামড়া ব্যবসায়ী, দড়ি ও সরঞ্জাম বিক্রেতা—সবাই এই অর্থনৈতিক চক্রের অংশ। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চল ও চরাঞ্চলের বহু পরিবার সারা বছর গবাদিপশু লালন-পালনের মাধ্যমে কুরবানীর মৌসুমে বড় অঙ্কের আয় করে থাকে।
২০২৬ সালে কুরবানীর বাজারে প্রযুক্তির ব্যবহারও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অনলাইন পশুর হাট, মোবাইল আর্থিক লেনদেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক বিক্রয় ব্যবস্থার কারণে খামারিরা সরাসরি ক্রেতাদের কাছে পশু বিক্রি করতে পারছেন। ফলে মধ্যস্বত্বভোগীর সংখ্যা কমছে এবং উৎপাদকরা ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন। একইসঙ্গে মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমে কয়েক হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত লেনদেন হচ্ছে।
কুরবানীর অর্থনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো চামড়া শিল্প। কাঁচা চামড়া, হাড়, চর্বি ও অন্যান্য উপজাত দেশের রপ্তানিমুখী শিল্প, খাদ্য, ওষুধ ও প্রসাধনী খাতে গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে চামড়া সংরক্ষণ, বাজার ব্যবস্থাপনা ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কুরবানী শুধু অর্থনৈতিক প্রবাহই সৃষ্টি করে না; এটি সমাজে সম্পদের পুনর্বণ্টন, খাদ্য নিরাপত্তা ও সামাজিক সংহতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। লাখো নিম্নআয়ের পরিবার বছরে অন্তত একবার পর্যাপ্ত প্রাণিজ খাদ্য গ্রহণের সুযোগ পায়। সব মিলিয়ে কুরবানীর এই বিশাল অর্থনৈতিক কার্যক্রম বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতি, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা বাজার এবং সামগ্রিক জাতীয় অর্থনীতিকে নীরবে শক্তিশালী করে চলেছে।
