২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত শুধু যুদ্ধের সীমায় আটকে থাকেনি; বরং পুরো অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক বাস্তবতাকে বদলে দিয়েছে। গাজা, দক্ষিণ লেবানন ও দক্ষিণ সিরিয়ায় ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান সামরিক উপস্থিতি এখন আর সাময়িক অভিযান হিসেবে দেখা হচ্ছে না। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অনুসন্ধান, স্যাটেলাইট বিশ্লেষণ ও যুদ্ধসংক্রান্ত তথ্যভিত্তিক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, এসব এলাকায় ধীরে ধীরে স্থায়ী সামরিক নিয়ন্ত্রণ বলয় গড়ে তোলা হচ্ছে। আল জাজিরার অনুসন্ধান অনুযায়ী, গাজা, দক্ষিণ লেবানন ও দক্ষিণ সিরিয়া মিলিয়ে প্রায় এক হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা বর্তমানে সরাসরি ইসরায়েলি সামরিক নিয়ন্ত্রণের আওতায় রয়েছে। এই বিশ্লেষণে স্যাটেলাইট চিত্র, ভৌগোলিক তথ্যব্যবস্থা, যুদ্ধসংক্রান্ত তথ্যভাণ্ডার এবং যুদ্ধবিরতির পর প্রকাশিত সামরিক মানচিত্র ব্যবহার করা হয়েছে।
গাজায় যুদ্ধবিরতির পর ইসরায়েল যে “হলুদ সীমারেখা” প্রকাশ করে, সেটিকে তারা সামরিক নিয়ন্ত্রণ এলাকার সীমা হিসেবে উপস্থাপন করে। তবে অনুসন্ধানে দেখা যায়, বাস্তবে ইসরায়েলি বাহিনী ঘোষিত সীমার বাইরেও অগ্রসর হয়ে নতুন নিয়ন্ত্রণ অঞ্চল তৈরি করেছে। বিশেষ করে গাজা সিটির পূর্বাঞ্চল, শুজাইয়া ও তুফাহ এলাকায় যুদ্ধবিরতির পরও সামরিক অবস্থান সম্প্রসারণের অভিযোগ উঠেছে। এর ফলে বহু ফিলিস্তিনি পরিবার নতুন করে বাস্তুচ্যুত হয়েছে। একইভাবে দক্ষিণ লেবাননে যুদ্ধবিরতির পরও বহু গ্রাম ও আবাসিক এলাকায় ধ্বংসযজ্ঞ, সামরিক টহল ও অবকাঠামো ধ্বংসের চিহ্ন পাওয়া গেছে। স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, এসব অভিযান শুধু সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং বেসামরিক জনগণের ওপর চাপ সৃষ্টি এবং প্রতিরোধশক্তির সামাজিক ভিত্তি দুর্বল করার কৌশল হিসেবেও পরিচালিত হয়েছে।
দক্ষিণ সিরিয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল। সেখানে কোনো আনুষ্ঠানিক সীমারেখা ঘোষণা না করলেও অধিকৃত গোলান মালভূমির বাইরেও নতুন সামরিক পোস্ট স্থাপন করা হয়েছে। নিরস্ত্রীকৃত অঞ্চলেও নতুন সামরিক অবকাঠামো গড়ে ওঠার তথ্য পাওয়া গেছে, যা উত্তর থেকে দক্ষিণ পর্যন্ত একটি বিস্তৃত সামরিক করিডরের ইঙ্গিত দেয়। বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, এসব পদক্ষেপ শুধু নিরাপত্তা কৌশল নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি ভূখণ্ডগত প্রভাব প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার অংশ হতে পারে, যা “বৃহত্তর ইসরায়েল” ধারণাকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে। যদিও ইসরায়েল সরকার দাবি করে, এসব পদক্ষেপ হামাস, হিজবুল্লাহ ও ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর হুমকি মোকাবিলার জন্য নেওয়া হয়েছে, তবুও যুদ্ধবিরতির পরও নতুন সামরিক সীমারেখা তৈরি, জনবসতি ধ্বংস ও বেসামরিক মানুষের বাস্তুচ্যুতি মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তির সম্ভাবনাকে আরও দুর্বল করে তুলছে।
