ইসরায়েল এবং ইরানের মধ্যকার প্রত্যক্ষ সংঘাতের এক বছর পর মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে জয়-পরাজয়ের সমীকরণ সম্পূর্ণ নতুন মোড় নিয়েছে। যুদ্ধের সূচনালগ্নে ইসরায়েলের অত্যাধুনিক সামরিক সক্ষমতা, নিখুঁত বিমান হামলা ও গোয়েন্দা বিভাগের সাফল্যকে অনেকেই চূড়ান্ত বিজয় হিসেবে ধরে নিয়েছিলেন। তবে দীর্ঘমেয়াদে যুদ্ধের ফলাফল মূল্যায়ন করতে গিয়ে খোদ ইসরায়েলের ভেতর থেকেই এখন তীব্র আত্মসমালোচনা ও ভিন্ন সুর ভেসে আসছে। ইসরায়েলি গণমাধ্যম ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যাপক পরিকাঠামো ও সামরিক ক্ষয়ক্ষতির মুখোমুখি হওয়া সত্ত্বেও ইরান তার চতুর রাজনৈতিক ও কৌশলগত অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। উল্টো অনেক আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকের মতে, এই দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের ফলে সবচেয়ে বেশি রাজনৈতিক ও কৌশলগত ফায়দা লুটেছে তেহরানই, যা প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর যুদ্ধকালীন নীতিকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
সম্প্রতি ইসরায়েলের প্রভাবশালী দৈনিক মারিভ-এ প্রকাশিত একটি চাঞ্চল্যকর নিবন্ধে দাবি করা হয়, ইরানকে দুর্বল ও আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন ভাবার ক্ষেত্রে ইসরায়েলি নেতৃত্ব এক বিরাট কৌশলগত ভুল মূল্যায়নের পরিচয় দিয়েছে। ২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েল যখন ইরানের পারমাণবিক ও সামরিক স্থাপনাগুলোকে চিরতরে গুঁড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে "অপারেশন রাইজিং লায়ন" নামে এক বিশাল বিমান হামলা শুরু করে, তখন উদ্দেশ্য ছিল প্রতিপক্ষকে সম্পূর্ণ পঙ্গু করে দেওয়া। মোসাদের গোপন অভিযান এবং ইসরায়েলি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি ও উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তারা লক্ষ্যবস্তু হলেও, তেহরান কিন্তু দমে যায়নি। তারা পাল্টা শতাধিক ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে নিজেদের সামরিক অস্তিত্বের জানান দেয়। যদিও ইসরায়েলের বহুমাত্রিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সেই হামলাগুলোর বেশিরভাগই প্রতিহত করেছিল, তবে বিশ্লেষকদের মতে, আধুনিক যুদ্ধের মূল পরিমাপক কে কত বেশি ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ল তা নয়, বরং কে তার রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সফল করতে পারল।
পরবর্তী সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার নতুন কূটনৈতিক সমঝোতা এবং যুদ্ধবিরতির পর যে আন্তর্জাতিক দৃশ্যপট সামনে এসেছে, তা ইসরায়েলের জন্য বেশ অস্বস্তিকর। দেখা যাচ্ছে যে, ইসরায়েলের তীব্রতম হামলার পরও ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি ও মূল ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতার একটি বিশাল অংশ সম্পূর্ণ অক্ষত রাখতে সক্ষম হয়েছে। এর ফলে দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কাঠামো যেমন ভেঙে পড়েনি, তেমনি আন্তর্জাতিক দরকষাকষির টেবিলে তাদের গুরুত্বও কমেনি। অন্যদিকে, ইসরায়েলের ভেতরেই বিরোধী দলগুলো নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে কূটনৈতিক ব্যর্থতার অভিযোগ তুলছে, কারণ যুদ্ধের মূল ঘোষিত লক্ষ্যগুলোর অনেকগুলোই অপূর্ণ থেকে গেছে। এই সংঘাত প্রমাণ করেছে যে, আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে শুধু তাৎক্ষণিক সামরিক বিজয়ই শেষ কথা নয়; বরং রাজনৈতিক সহনশীলতা ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত দূরদর্শিতাই আসল বিজয় নির্ধারণ করে। ইরানকে রাতারাতি কোণঠাসা করার পরিকল্পনা ব্যর্থ হওয়ায় ইসরায়েলি বিশ্লেষকরা এখন স্বীকার করছেন যে, প্রতিপক্ষকে অবমূল্যায়ন করাই ছিল তাদের সবচেয়ে বড় ভুল।
