আন্তর্জাতিক অপরাধ দমন ও পলাতক আসামিদের শনাক্তকরণে বিশ্বের সবচেয়ে বড় পুলিশ সহযোগিতা সংস্থা ইন্টারপোলের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সংস্থাটির মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকায় ৬০ জন বাংলাদেশির নাম রয়েছে। সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারির বিষয়টি আলোচনায় আসার পর ইন্টারপোলের কার্যক্রম ও রেড নোটিশ ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে জনমনে আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। ইন্টারপোলের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী বর্তমানে ৬ হাজার ৪৪৪ জন মোস্ট ওয়ান্টেড ব্যক্তির তথ্য তাদের আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কে সক্রিয় রয়েছে, যার মধ্যে ৬০ জন বাংলাদেশি বিভিন্ন গুরুতর অপরাধের অভিযোগে অনুসন্ধানাধীন।
তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, প্রকাশ্যে প্রদর্শিত সংখ্যার চেয়েও প্রকৃত সংখ্যা বেশি হতে পারে। কারণ নিরাপত্তা ও তদন্তগত স্বার্থে অনেক সময় অভিযুক্তদের নাম, ছবি ও পরিচয় সংস্থাটির উন্মুক্ত তালিকায় প্রকাশ করা হয় না। যদিও এসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে জারি করা রেড নোটিশ ইন্টারপোলের ১৯৬টি সদস্য রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নেটওয়ার্কে কার্যকর থাকে এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলো প্রয়োজনীয় নজরদারি পরিচালনা করে।
তালিকাভুক্ত বাংলাদেশিদের বিরুদ্ধে হত্যা, হত্যাচেষ্টা, মানবপাচার, অস্ত্র অপরাধ, অর্থ আত্মসাৎ, জালিয়াতি, চোরাচালান, যৌন নির্যাতন, পর্নোগ্রাফি সংক্রান্ত অপরাধ এবং বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন লঙ্ঘনসহ বিভিন্ন গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। সিঙ্গাপুর, যুক্তরাষ্ট্র, মালয়েশিয়া, বেলজিয়াম, ভারত, মালদ্বীপ, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ইসওয়াতিনিসহ একাধিক দেশ বিভিন্ন মামলায় বাংলাদেশি নাগরিকদের খুঁজছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ সরকারও বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার দণ্ডপ্রাপ্ত কয়েকজন পলাতক আসামি, শীর্ষ সন্ত্রাসী এবং মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের দেশে ফিরিয়ে আনতে ইন্টারপোলের সহযোগিতা চেয়েছে।
এ ছাড়া লিবিয়াসহ বিভিন্ন দেশে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে মানবপাচার, অপহরণ, মুক্তিপণ আদায় ও হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত কয়েকজন বাংলাদেশিকেও আন্তর্জাতিকভাবে অনুসন্ধান করা হচ্ছে। বিভিন্ন অপরাধে অভিযুক্ত এসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে তথ্য বিনিময়, অবস্থান শনাক্তকরণ এবং আইনগত সহযোগিতার মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা চলছে।
১৯২৩ সালে প্রতিষ্ঠিত ইন্টারপোল বর্তমানে ১৯৬টি সদস্য রাষ্ট্র নিয়ে বিশ্বের বৃহত্তম আন্তর্জাতিক পুলিশ সহযোগিতা সংস্থা হিসেবে কাজ করছে। আন্তসীমান্ত অপরাধ দমন, অপরাধী শনাক্তকরণ এবং সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে দ্রুত তথ্য আদান-প্রদানের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা জোরদার করাই সংস্থাটির প্রধান লক্ষ্য। বিশেষজ্ঞদের মতে, রেড নোটিশ কোনো আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা নয়; বরং এটি সদস্য রাষ্ট্রগুলোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা, যার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে শনাক্ত, নজরদারি এবং স্থানীয় আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে সহায়তা করা হয়। ফলে ইন্টারপোলের এই ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক অপরাধ দমনে একটি গুরুত্বপূর্ণ সমন্বয় কাঠামো হিসেবে ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে।
