ভারত আগামী পাঁচ বছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রায় পাঁচশ বিলিয়ন ডলার মূল্যের জ্বালানি, প্রযুক্তি ও কৃষিপণ্য আমদানির আগ্রহ দেখিয়েছে বলে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সাম্প্রতিক বক্তব্য আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও ভূরাজনীতিতে বড় ধরনের আলোচনা সৃষ্টি করেছে। দিল্লিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর তিনি এই সম্ভাব্য বাণিজ্য সমঝোতার কথা জানান। বিশ্লেষকদের মতে, এই উদ্যোগ শুধু একটি অর্থনৈতিক চুক্তি নয়, বরং এটি যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, চীন ও রাশিয়াকে ঘিরে গড়ে ওঠা বৃহত্তর কৌশলগত প্রতিযোগিতার অংশ। বিশেষ করে ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করতে চাইছে।
এই সম্ভাব্য সমঝোতার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক সুবিধা পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ বিপুল পরিমাণ আমদানির ফলে মার্কিন জ্বালানি, কৃষি ও প্রযুক্তি খাতের জন্য একটি বিশাল বাজার নিশ্চিত হবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে ভারতকে রাশিয়ার জ্বালানি নির্ভরতা থেকে সরিয়ে নিজেদের জ্বালানি বলয়ের দিকে আনতে চেষ্টা করছে। এই প্রেক্ষাপটে মার্কিন জ্বালানি সরবরাহকে ভারতের জন্য বিকল্প উৎস হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। এছাড়া এই চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ মার্কিন প্রশাসন নিজেদের রপ্তানি বৃদ্ধি ও বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর নীতিকে বড় সাফল্য হিসেবে তুলে ধরতে চায়।
অন্যদিকে ভারতের জন্যও কিছু কৌশলগত সুবিধা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সম্পর্ক ভারতের উন্নত প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ও বিকল্প জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক কৌশলগত জোটে ভারতের অবস্থান আরও শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে দেশের ভেতরে এই চুক্তিকে ঘিরে সমালোচনাও বাড়ছে। অনেক অর্থনীতিবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করছেন, এত বড় অঙ্কের আমদানি ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে এবং ডলারের বিপরীতে দুর্বল হতে থাকা রুপির মান আরও কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে বিদেশি কৃষিপণ্য ও প্রযুক্তিপণ্যের প্রবেশ দেশীয় ক্ষুদ্র কৃষক ও শিল্পখাতের জন্য বড় প্রতিযোগিতা তৈরি করবে।
সমালোচকদের মতে, ভারত দীর্ঘদিন ধরে দেশীয় শিল্প রক্ষা ও আত্মনির্ভর অর্থনীতির কথা বললেও এখন বিপুল বিদেশি আমদানির দিকে ঝুঁকছে, যা রাজনৈতিকভাবে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও অনেকেই এই পদক্ষেপকে যুক্তরাষ্ট্রের চাপের কাছে নতি স্বীকার হিসেবে দেখছেন। তবে এখনো ভারত সরকার এই সম্ভাব্য চুক্তির পূর্ণাঙ্গ কাঠামো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেনি, ফলে বিষয়টি নিয়ে কিছু অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সমঝোতা বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষ করে ভারত যদি ধীরে ধীরে যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক বলয়ের দিকে আরও ঝুঁকে পড়ে, তাহলে রাশিয়ার সঙ্গে ঐতিহ্যগত সম্পর্ক এবং এশিয়ার আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য নতুন চাপে পড়তে পারে।
