ভারতের শেয়ারবাজারে টানা চার কার্যদিবসের নজিরবিহীন ধস দেশটির অর্থনীতি ও বিনিয়োগ পরিবেশ নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে বিনিয়োগকারীদের প্রায় ১৬ লাখ ৭৭ হাজার কোটি রুপির সম্পদ বাজার থেকে মুছে গেছে, যা সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় আর্থিক ধাক্কাগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। প্রধান শেয়ার সূচক সেনসেক্স প্রায় দেড় হাজার পয়েন্ট কমে ৭৪ হাজারের ঘরে নেমে এসেছে এবং চার দিনে সামগ্রিক পতন চার শতাংশেরও বেশি হয়েছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এই ধস কেবল স্বাভাবিক মুনাফা তুলে নেওয়ার ফল নয়; বরং এটি বিনিয়োগকারীদের গভীর আস্থাহীনতা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার সরাসরি প্রতিফলন।
বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য হঠাৎ বেড়ে যাওয়া পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং হরমুজ প্রণালী ঘিরে অনিশ্চয়তার কারণে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৭ ডলারের বেশি পৌঁছেছে। ভারত যেহেতু বিপুল পরিমাণ জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল, তাই তেলের এই মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি দেশটির বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, শিল্প উৎপাদন এবং পরিবহন ব্যয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। একই সঙ্গে ডলারের বিপরীতে ভারতীয় রুপির রেকর্ড দরপতন বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আরও আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। ফলে বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা ধারাবাহিকভাবে ভারতীয় বাজার থেকে অর্থ তুলে নিচ্ছেন, যা শেয়ারবাজারে বিক্রির চাপ কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
এই ধসের সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে তথ্যপ্রযুক্তি, আবাসন ও শিল্প খাতে। দেশের শীর্ষস্থানীয় বহু প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম বড় আকারে পড়ে গেছে। বাজারে একদিনেই তিন হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দর কমেছে, বিপরীতে খুব অল্প সংখ্যক প্রতিষ্ঠানের শেয়ার সামান্য বেড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই চিত্র স্পষ্টভাবে দেখাচ্ছে যে বাজারে ইতিবাচক মনোভাব প্রায় অনুপস্থিত। বিশেষ করে আমদানিনির্ভর খাত যেমন বিমান চলাচল, রাসায়নিক ও রং শিল্প সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে রয়েছে। তবে ওষুধ, নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য এবং বৈদ্যুতিক যানবাহন খাত তুলনামূলকভাবে কিছুটা স্থিতিশীল থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, বর্তমান সংকট থেকে উত্তরণে ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত সিদ্ধান্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। সুদের হার, মুদ্রানীতি এবং বাজারে তারল্য নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে না পারলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট দ্রুত সমাধান না হলে ভারতীয় অর্থনীতি ও পুঁজিবাজারে এই অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
