২০২৬ সালের প্রথম পাঁচ মাসে ভারতের শেয়ারবাজারে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের টানা ও ব্যাপক মূলধন প্রত্যাহার দেশটির পুঁজিবাজার ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলেছে। ন্যাশনাল সিকিউরিটিজ ডিপোজিটরি লিমিটেডের তথ্য অনুযায়ী, মে মাসেই বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগকারীরা ভারতীয় ইক্যুইটি বাজার থেকে প্রায় ৩২ হাজার ৯৬৩ কোটি রুপি তুলে নিয়েছেন। এর ফলে জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত মোট প্রত্যাহারের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ লাখ ২৪ হাজার ৯৩২ কোটি রুপি, যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি এবং বাজারে একটি স্পষ্ট চাপের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এই ধারাবাহিক পুঁজি বহির্গমনের পেছনে একাধিক বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ কারণ কাজ করছে। মধ্যপ্রাচ্যে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, বিশেষ করে সংঘাত বৃদ্ধির ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় একশো ডলারের কাছাকাছি পৌঁছে যায়। ভারত যেহেতু তার অধিকাংশ জ্বালানি চাহিদা আমদানি করে, তাই এই মূল্যবৃদ্ধি দেশটির আমদানি ব্যয় বাড়িয়ে দেয় এবং চলতি হিসাবের ঘাটতির ওপর চাপ সৃষ্টি করে। একই সঙ্গে ডলারের তুলনায় ভারতীয় রুপির অবমূল্যায়ন বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমিয়ে দেয়, কারণ এতে তাদের মুনাফার প্রকৃত মূল্য হ্রাস পায়।
অন্যদিকে বৈশ্বিক পুঁজিবাজারে প্রযুক্তিনির্ভর খাত, বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও উন্নত প্রযুক্তি নির্ভর অর্থনীতির দিকে বিনিয়োগকারীদের ঝোঁক বাড়ায় ভারতের মতো উদীয়মান বাজার থেকে মূলধন সরে যাচ্ছে। পাশাপাশি মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচ্চ সুদের হার নীতি এবং বিশ্বব্যাপী ঝুঁকি এড়ানোর প্রবণতাও এই প্রবাহকে ত্বরান্বিত করছে।
মাসভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বছরের শুরুতে জানুয়ারিতে বড় পরিমাণ প্রত্যাহার হলেও ফেব্রুয়ারিতে কিছুটা ইতিবাচক প্রবাহ দেখা গিয়েছিল। তবে মার্চ মাসে রেকর্ড পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ১৭ হাজার কোটি রুপি এবং এপ্রিল মাসে আরও প্রায় ৬০ হাজার কোটি রুপি বাজার থেকে বেরিয়ে যায়। মে মাসে এই প্রবণতা অব্যাহত থেকে আরও প্রায় ৩৩ হাজার কোটি রুপির বিক্রয় চাপ তৈরি হয়।
তবে এত চাপের মধ্যেও ভারতের অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগকারীরা বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। দেশীয় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী এবং খুচরা বিনিয়োগকারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ বাজারকে বড় ধরনের পতন থেকে কিছুটা রক্ষা করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে, তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে এলে এবং মুদ্রাবাজারে ভারসাম্য ফিরলে বিদেশি বিনিয়োগ আবারও ভারতীয় বাজারে ফিরে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে আপাতত এই ধারাবাহিক পুঁজি বহির্গমন ভারতের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্ক সংকেত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
