মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত জলপথ হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে চলমান যুদ্ধ ও অচলাবস্থা এখন উপসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনীতিকে গভীর সংকটে ফেলেছে। বিশ্বের মোট সমুদ্রপথে পরিবাহিত জ্বালানির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে যাতায়াত করে। ফলে এই রুটে দীর্ঘমেয়াদি অচলাবস্থা সৃষ্টি হলে তা শুধু আঞ্চলিক নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।
উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের ছয় দেশ—সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, ওমান ও বাহরাইন—দীর্ঘদিন ধরে তেল ও গ্যাস রপ্তানি, পর্যটন এবং রিয়েল এস্টেট খাতের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতি ও নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে এসব খাত মারাত্মক চাপের মুখে পড়েছে। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, যেখানে এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ২০২৫ সালে প্রায় চার দশমিক চার শতাংশ হওয়ার কথা ছিল, সেখানে ২০২৬ সালে তা কমে মাত্র এক দশমিক তিন শতাংশে নেমে আসতে পারে।
দেশভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, কাতার সবচেয়ে বড় ধাক্কা খাচ্ছে। পূর্বে যেখানে পাঁচ দশমিক তিন শতাংশ প্রবৃদ্ধির আশা করা হয়েছিল, সেখানে এখন প্রায় পাঁচ দশমিক সাত শতাংশ অর্থনৈতিক সংকোচনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানি ব্যাহত হওয়ায় এই পতন আরও গভীর হচ্ছে। কুয়েতেও পরিস্থিতি একই রকম, যেখানে দুই দশমিক ছয় শতাংশ প্রবৃদ্ধির বদলে প্রায় ছয় দশমিক চার শতাংশ সংকোচনের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব তুলনামূলকভাবে বিকল্প পাইপলাইন ব্যবহারের মাধ্যমে কিছুটা স্থিতিশীলতা বজায় রাখলেও তাদের প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। আমিরাতের প্রবৃদ্ধি পাঁচ শতাংশ থেকে কমে প্রায় দুই দশমিক চার শতাংশে নেমে এসেছে, আর সৌদি আরবের প্রবৃদ্ধি চার দশমিক তিন শতাংশ থেকে কমে তিন দশমিক এক শতাংশে দাঁড়াতে পারে। বাহরাইন ও ওমানও অর্থনৈতিক ধীরগতির মুখে পড়েছে, যদিও ওমান তুলনামূলকভাবে অ-তেল খাতে বৈচিত্র্য আনার কারণে কিছুটা স্থিতিশীল অবস্থানে রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে তেলের দাম সাময়িকভাবে বাড়লেও তা স্থায়ী হবে না। কারণ সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়লে বিশ্ববাজারে চাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্য নষ্ট হবে। এর ফলে শুধু জ্বালানি খাত নয়, শিপিং, পর্যটন, বিদেশি বিনিয়োগ এবং রিয়েল এস্টেট খাতেও বড় ধরনের পতন ঘটতে পারে।
আঞ্চলিক বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, হরমুজ প্রণালি যদি দ্রুত স্বাভাবিক না হয়, তাহলে উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে কয়েক বছর লেগে যেতে পারে। এমনকি যুদ্ধ শেষ হলেও দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ক্ষতি ও বিনিয়োগ অনিশ্চয়তা থেকে যাবে, যা পুরো মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনৈতিক কাঠামোকে নতুন করে পুনর্গঠনের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
