মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতি ও ফরাসি ভূ-রাজনীতি: লেবাননকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যের দ্রুত পরিবর্তনশীল ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় নিজেদের ক্রমহ্রাসমান কূটনৈতিক অবস্থান পুনরুদ্ধার করতে এক নতুন ও সুদূরপ্রসারী মাস্টারপ্ল্যান নিয়ে মাঠে নেমেছে ফ্রান্স। ২০২৬ সালের জুনের শুরুতে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর বিশেষ দূত জঁ-ইভ ল্য দ্রিয়াঁ (Jean-Yves Le Drian) বৈরুত সফরে এসেছেন। এই সফরের মূল লক্ষ্য হলো—লেবাননের রাষ্ট্রপতি, সংসদের স্পিকার এবং অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে জরুরি বৈঠক করে দেশটির গভীর অর্থনৈতিক দেউলিয়াত্ব, ইসরায়েল-হিজবুল্লাহ যুদ্ধবিরতি পরবর্তী ভঙ্গুর নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং দক্ষিণ লেবাননে নিয়োজিত জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশন ‘ইউনিফিল’ (UNIFIL)-এর ভবিষ্যৎ রূপরেখা নির্ধারণ করা। সাম্প্রতিক সংঘাতের জেরে লেবাননে যে তীব্র মানবিক ও বাস্তুচ্যুত জনগণের সংকট তৈরি হয়েছে, সেখানে প্যারিস নিজেকে অন্যতম প্রধান ত্রাণকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে।লেবাননের ওপর ফ্রান্সের এই গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক আকর্ষণের পেছনে রয়েছে বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধের ঔপনিবেশিক ম্যান্ডেট ও ঐতিহাসিক সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার। তবে বর্তমান ২০২৬ সালের প্রেক্ষাপটে এই কূটনৈতিক তৎপরতার নেপথ্যে প্যারিসের নিজস্ব কৌশলগত, অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ এবং ভূ-মধ্যসাগরীয় উপকূলীয় জ্বালানি অনুসন্ধান (Gas Exploration) সংক্রান্ত অর্থনৈতিক স্বার্থ জড়িত। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, লেবাননের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা ইস্যুতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের (USA) প্রভাব অভাবনীয়ভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় ফরাসি কূটনীতি এক অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। ওয়াশিংটনের এই একচ্ছত্র আধিপত্যের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক বা অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায় না গিয়ে ফ্রান্স তার ঐতিহ্যগত ‘সফট পাওয়ার’, ঐতিহাসিক বিশ্বাস এবং ধারাবাহিক কূটনৈতিক সম্পৃক্ততাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে।নিচে লেবাননে ফ্রান্সের নতুন কূটনৈতিক মিশন এবং এর ভূ-রাজনৈতিক প্রভাবের একটি সারণি দেওয়া হলো:ফরাসি কূটনৈতিক মিশন ও প্রতিনিধিলেবাননের বর্তমান ফ্রন্টলাইন সংকট (২০২৬)কৌশলগত স্বার্থ ও মার্কিন-ফ্রান্স প্রতিযোগিতাবিশেষ দূত জঁ-ইভ ল্য দ্রিয়াঁ-র বৈরুত সফর ও শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্বের সাথে বৈঠক।ইসরায়েল-হিজবুল্লাহ সংঘাত পরবর্তী সীমান্ত উত্তেজনা এবং দক্ষিণ লেবাননে UNIFIL-এর ভূমিকা রক্ষা।মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান একক আধিপত্যের মুখে ফ্রান্সের নিজস্ব ‘সফট পাওয়ার’ ধরে রাখার চেষ্টা।ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক যোগসূত্রফরাসি ম্যান্ডেটের আমল থেকে গড়ে ওঠা প্রশাসনিক ও ভাষাগত প্রভাবকে পুনরুজ্জীবিত করা।লেবাননের ভঙ্গুর ব্যাংক ব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে ফরাসি আর্থিক প্যাকেজের টোপ।ভূ-অর্থনৈতিক স্বার্থবৈরুত ও ত্রিপোলি বন্দরের বাণিজ্যিক নিয়ন্ত্রণ এবং পূর্ব ভূ-মধ্যসাগরের গ্যাস ব্লকে ফরাসি বিনিয়োগ রক্ষা।ইউরোপ অভিমুখে লেবাননি ও সিরীয় শরণার্থীদের অবৈধ অভিবাসন প্রবাহ বৈরুত উপকূলেই আটকে দেওয়া।আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ: লেবাননে ফ্রান্সের বর্তমান চালটি মূলত আরব বিশ্বে ফরাসি প্রাসঙ্গিকতা টিকিয়ে রাখার এক চূড়ান্ত চেষ্টা। প্যারিস খুব ভালো করেই জানে যে, বৈরুত যদি সম্পূর্ণভাবে ওয়াশিংটন বা তেহরানের অক্ষের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, তবে ভূ-মধ্যসাগরীয় অঞ্চলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (EU) কৌশলগত গুরুত্ব অনেকটাই পঙ্গু হয়ে পড়বে। তাই সামরিক শক্তির প্রদর্শন ছাড়াই কেবল ঐতিহাসিক বিশ্বাসকে পুঁজি করে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ সমীকরণে নিজেদের একটি ‘অপরিহার্য মধ্যস্থতাকারী’ (Indispensable Mediator) হিসেবে টিকিয়ে রাখাই এখন ফরাসি পররাষ্ট্র নীতির প্রধান এজেন্ডা।
ফ্রান্স কেন এখনো লেবাননের ভবিষ্যৎ নিয়ে এতটা আগ্রহী?
লেবাননে প্রভাব ধরে রাখতে নতুন কূটনৈতিক উদ্যোগ নিয়েছে ফ্রান্স। আঞ্চলিক সংঘাত, অর্থনৈতিক সংকট ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে এই তৎপরতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সম্পর্কিত খবর
ইউক্রেনের মার্কিন অর্থায়িত ল্যাবগুলো নিয়ে সাবেক সিআইএ কর্মকর্তা জৈব অস্ত্র গবেষণার অভিযোগ করেছেন। দাবি অনুযায়ী রাশিয়ার বিরুদ্ধে সম্ভাব্য জৈবিক লক্ষ্যবস্তু তৈরির ইঙ্গিত রয়েছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও কাতার জব্দকৃত ৬ বিলিয়ন ডলার ইরানি সম্পদ মানবিক কাজে ব্যবহারের পরিকল্পনা করছে, যা ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চূড়ান্ত চুক্তি আলোচনায় উৎসাহ দিতে পারে। তবে ইরান এখনো সম্মতি দেয়নি।
স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের প্রতিবেদনে দক্ষিণ কোরিয়া অস্ত্র রপ্তানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে বিশ্বে নবম স্থানে পৌঁছেছে। ইউরোপীয় বাজারে এর প্রভাব বাড়ছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত হরমুজ প্রণালীর ওপর নির্ভরতা শূন্যে নামাতে বন্দর, পাইপলাইন ও রেল অবকাঠামো সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নিয়েছে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে কৌশলগত প্রভাব ফেলতে পারে।