মধ্যপ্রাচ্যে ইরান যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনার ফলে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে তীব্র অস্থিরতা তৈরি হওয়ায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন রাশিয়ার বিরুদ্ধে তাদের নীতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন বিবেচনা করছে। আন্তর্জাতিক তেল বাজারে দাম দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় রাশিয়ার অপরিশোধিত তেলের ওপর আরোপিত মূল্যসীমা সাময়িকভাবে স্থগিত বা পুনর্বিবেচনার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে বলে ব্লুমবার্গ জানিয়েছে। বর্তমানে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার অধীনে প্রতি ছয় মাস অন্তর এই মূল্যসীমা সমন্বয় করা হয় এবং তা বাজার গড় দামের চেয়ে প্রায় পনেরো শতাংশ কম রাখা হয়। এই নিয়ম অনুযায়ী রাশিয়ার তেলের বর্তমান মূল্যসীমা প্রতি ব্যারেল ৪৪ দশমিক ১০ মার্কিন ডলার নির্ধারিত রয়েছে। তবে পরিস্থিতি বদলে যাওয়ায় আগামী পুনর্মূল্যায়নের সময় এটি ৬৫ ডলারেরও বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এই অবস্থায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের নীতিনির্ধারকেরা কয়েকটি বিকল্প বিবেচনা করছেন, যার মধ্যে রয়েছে বর্তমান মূল্যসীমা অপরিবর্তিত রাখা, চলতি বছরের শেষ পর্যন্ত স্বয়ংক্রিয় সমন্বয় স্থগিত করা অথবা মূল্যসীমা বাড়লেও তা সাত শিল্পোন্নত দেশের জোটের পূর্ব নির্ধারিত ৬০ ডলারের সীমার মধ্যে রাখা। একই সঙ্গে রাশিয়ার বিরুদ্ধে প্রস্তাবিত একবিংশ নিষেধাজ্ঞা প্যাকেজে আরও কঠোর পদক্ষেপ যুক্ত করার পরিকল্পনাও চলছে। এর মধ্যে রয়েছে অতিরিক্ত ব্যাংক, তেল ব্যবসায়ী, তেল শোধনাগার এবং ক্রিপ্টোকারেন্সি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ। পাশাপাশি রাশিয়ার তথাকথিত ছায়া ট্যাংকার বহরের প্রায় বিশটি জাহাজকে লক্ষ্য করে নতুন বিধিনিষেধ আরোপের কথাও বিবেচনা করা হচ্ছে, যেগুলোর মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে তেল পরিবহন করা হয়। এছাড়া রাশিয়াকে নিষিদ্ধ পণ্য সরবরাহের অভিযোগে চীন, ভারত, তুরস্ক এবং মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ওপরও কঠোর রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আরোপের বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে। ভবিষ্যতে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের চালানের ওপর নতুন সীমাবদ্ধতা আরোপের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে না। একই সঙ্গে রাশিয়ার আদালতের পাল্টা আইনি পদক্ষেপের মুখে ইউরোপের আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইউরোক্লিয়ারের সম্পদ সুরক্ষিত রাখার জন্য নতুন কাঠামো তৈরির বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, একদিকে রাশিয়ার যুদ্ধ সক্ষমতা দুর্বল করার কৌশল এবং অন্যদিকে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার স্থিতিশীল রাখার প্রয়োজনের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সিদ্ধান্তগুলোর সম্ভাব্য প্রভাব শুধু ইউরোপেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তেলের বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়লে উন্নয়নশীল দেশগুলোর আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পেতে পারে এবং মূল্যস্ফীতির চাপ আরও তীব্র হতে পারে। অন্যদিকে ইউরোপের ভেতরেও এই নীতি নিয়ে মতভেদ তৈরি হয়েছে, কারণ কিছু দেশ রাশিয়ার ওপর কঠোর অবস্থান চাইছে, আবার কিছু দেশ জ্বালানি নিরাপত্তা বিবেচনায় নমনীয় পন্থা গ্রহণ করতে বলছে। এই দ্বন্দ্ব ইউরোপীয় ইউনিয়নের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলছে। বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে রাশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি কাঠামোকে দীর্ঘমেয়াদে প্রভাবিত করবে। ফলে বর্তমান পরিস্থিতি শুধু নিষেধাজ্ঞার বিষয় নয়, বরং আন্তর্জাতিক শক্তি রাজনীতি ও অর্থনৈতিক ভারসাম্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
রাশিয়ার বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ নিতে চলেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন।
মধ্যপ্রাচ্য সংকট ও হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনার কারণে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। এ পরিস্থিতিতে রাশিয়ার তেলের মূল্যসীমা নীতি পরিবর্তন বিবেচনা করছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন।

সম্পর্কিত খবর
ইউক্রেনের মার্কিন অর্থায়িত ল্যাবগুলো নিয়ে সাবেক সিআইএ কর্মকর্তা জৈব অস্ত্র গবেষণার অভিযোগ করেছেন। দাবি অনুযায়ী রাশিয়ার বিরুদ্ধে সম্ভাব্য জৈবিক লক্ষ্যবস্তু তৈরির ইঙ্গিত রয়েছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও কাতার জব্দকৃত ৬ বিলিয়ন ডলার ইরানি সম্পদ মানবিক কাজে ব্যবহারের পরিকল্পনা করছে, যা ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চূড়ান্ত চুক্তি আলোচনায় উৎসাহ দিতে পারে। তবে ইরান এখনো সম্মতি দেয়নি।
স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের প্রতিবেদনে দক্ষিণ কোরিয়া অস্ত্র রপ্তানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে বিশ্বে নবম স্থানে পৌঁছেছে। ইউরোপীয় বাজারে এর প্রভাব বাড়ছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত হরমুজ প্রণালীর ওপর নির্ভরতা শূন্যে নামাতে বন্দর, পাইপলাইন ও রেল অবকাঠামো সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নিয়েছে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে কৌশলগত প্রভাব ফেলতে পারে।