বিশ্ব প্রযুক্তি ও ভূরাজনীতির নতুন প্রতিযোগিতায় এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত উপাদানগুলোর একটি হলো গ্যালিয়াম নামের ধাতু, যা আধুনিক সেমিকন্ডাক্টর শিল্প, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বৈদ্যুতিক যান, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, সামরিক প্রযুক্তি এবং মহাকাশ গবেষণার জন্য অপরিহার্য কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বিশেষ করে গ্যালিয়াম নাইট্রাইড ও গ্যালিয়াম আর্সেনাইড প্রযুক্তি উচ্চগতির চিপ, রাডার ব্যবস্থা, ফাইভজি নেটওয়ার্ক, স্টেলথ যুদ্ধবিমান এবং স্যাটেলাইট যোগাযোগ ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় নব্বই থেকে পঁচানব্বই শতাংশ প্রাথমিক গ্যালিয়াম উৎপাদন এককভাবে চীনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, যা বৈশ্বিক প্রযুক্তি সরবরাহ ব্যবস্থায় এক ধরনের কাঠামোগত নির্ভরতা তৈরি করেছে।
গ্যালিয়াম সরাসরি খনি থেকে উত্তোলিত হয় না, বরং অ্যালুমিনিয়াম উৎপাদনের উপজাত হিসেবে এটি সংগ্রহ করা হয়, যার জন্য প্রয়োজন অত্যন্ত জটিল শিল্প অবকাঠামো ও দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়াজাত সক্ষমতা। চীন গত কয়েক দশকে ভর্তুকি, সস্তা শ্রম এবং শিথিল পরিবেশ নীতির মাধ্যমে এই খাতে শক্তিশালী শিল্প ভিত্তি গড়ে তুলেছে, যার ফলে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের অনেক উৎপাদন কেন্দ্র ধীরে ধীরে পিছিয়ে পড়ে বা বন্ধ হয়ে গেছে। এই পরিস্থিতিতে ২০২৩ সালে চীন জাতীয় নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে গ্যালিয়াম ও সংশ্লিষ্ট ধাতুর রপ্তানিতে লাইসেন্স ব্যবস্থা চালু করে, যা বৈশ্বিক বাজারে বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি মূলত যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি নিষেধাজ্ঞার পাল্টা কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হয়।
বর্তমানে গ্যালিয়াম নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে বিশ্বে একটি নতুন ধরনের প্রযুক্তি শীতল যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেখানে একদিকে যুক্তরাষ্ট্র উন্নত চিপ প্রযুক্তি ও রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে চীনের অগ্রগতি সীমিত করার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে চীন গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালের সরবরাহ নিয়ন্ত্রণকে কৌশলগত চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। যুক্তরাষ্ট্র একসময় গ্যালিয়াম উৎপাদনে সক্ষম থাকলেও বর্তমানে দেশটি প্রায় সম্পূর্ণভাবে আমদানিনির্ভর হয়ে পড়েছে। নতুন করে দেশীয় উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে বিশাল অবকাঠামো, পরিবেশগত অনুমোদন এবং দীর্ঘ সময় প্রয়োজন, যা তাৎক্ষণিক সমাধান নয়।
ফলে গ্যালিয়াম এখন শুধু একটি ধাতু নয়, বরং বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য নির্ধারণকারী কৌশলগত সম্পদে পরিণত হয়েছে। এর নিয়ন্ত্রণ ভবিষ্যতের প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং অর্থনৈতিক আধিপত্যকে গভীরভাবে প্রভাবিত করতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতে নতুন শক্তির পুনর্বিন্যাস ঘটাতে পারে এবং চীন-যুক্তরাষ্ট্র প্রতিযোগিতাকে আরও জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি প্রযুক্তি সংঘাতে রূপান্তরিত করছে।
