চীনের বিজ্ঞানীরা এমন এক নতুন ধরনের লোহাভিত্তিক প্রবাহ ব্যাটারি উদ্ভাবন করেছেন, যা ভবিষ্যতের বিদ্যুৎ সংরক্ষণ প্রযুক্তিতে বড় পরিবর্তন আনতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। চীনা বিজ্ঞান একাডেমির ধাতু গবেষণা প্রতিষ্ঠানের গবেষকদের দাবি, এই ব্যাটারি টানা প্রায় ষোলো বছর পর্যন্ত কার্যক্ষম থাকতে পারে এবং এর উৎপাদন ব্যয় বর্তমানে ব্যবহৃত লিথিয়ামভিত্তিক ব্যাটারির তুলনায় বহু গুণ কম। সহজলভ্য লোহাকে মূল উপাদান হিসেবে ব্যবহার করায় এটি শুধু সাশ্রয়ী নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এই নতুন প্রযুক্তিতে তরল ইলেক্ট্রোলাইটের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সংরক্ষণ ও সরবরাহ করা হয়। গবেষকরা এতে বিশেষ ধরনের লোহা অণুসমষ্টি ব্যবহার করেছেন, যা রাসায়নিক ক্ষয় কমায় এবং চার্জ অপচয় প্রতিরোধ করে। বাস্তব পরীক্ষায় ব্যাটারিটি প্রায় সম্পূর্ণরূপে চার্জ ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে, যা এর নির্ভরযোগ্যতা ও দীর্ঘস্থায়িত্বের প্রমাণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বর্তমান বিশ্বে লিথিয়াম ও অন্যান্য বিরল ধাতুর ঘাটতির কারণে ব্যাটারির দাম ক্রমাগত বাড়ছে। সেই প্রেক্ষাপটে সহজলভ্য ও কমদামি লোহাভিত্তিক এই প্রযুক্তি বিশ্বব্যাপী শক্তি সংরক্ষণ ব্যবস্থায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো উৎপাদনের অস্থিরতা। সৌর ও বায়ুশক্তি সবসময় সমানভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে না। ফলে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ দীর্ঘ সময় ধরে সংরক্ষণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। চীনের এই নতুন ব্যাটারি সেই সমস্যার কার্যকর সমাধান হতে পারে। বৃহৎ বিদ্যুৎকেন্দ্র, নগর বিদ্যুৎ ব্যবস্থা এবং শিল্প খাতে এটি ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হলে বিদ্যুৎ সরবরাহ আরও স্থিতিশীল করা সম্ভব হবে।
নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও এই প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা দিচ্ছে। প্রচলিত লিথিয়ামভিত্তিক ব্যাটারিতে অতিরিক্ত তাপ বা ত্রুটির কারণে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি থাকে। কিন্তু লোহাভিত্তিক প্রবাহ ব্যাটারি তুলনামূলকভাবে নিরাপদ এবং দাহ্য নয়। তাই ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা কিংবা বড় বিদ্যুৎ সংরক্ষণ প্রকল্পে এটি ব্যবহারের সম্ভাবনা বেশি বলে মনে করছেন গবেষকরা।
যদিও প্রযুক্তিটি এখনো ব্যাপক শিল্প উৎপাদনের পর্যায়ে পৌঁছায়নি, তবুও বিজ্ঞানীরা আশাবাদী যে সফল বাণিজ্যিক প্রয়োগ সম্ভব হলে এটি বৈশ্বিক জ্বালানি ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনবে। কম খরচে দীর্ঘস্থায়ী বিদ্যুৎ সংরক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার আরও দ্রুত বাড়বে এবং পরিবেশবান্ধব শক্তি ব্যবস্থার পথে বিশ্ব আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে।
