মার্কিন প্রযুক্তি নিষেধাজ্ঞা ও উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চিপ রপ্তানিতে কড়াকড়ির মধ্যেও চীন দেশীয় প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা বাড়িয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে বলে জানা গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই নিষেধাজ্ঞাগুলো উল্টোভাবে চীনের জন্য আত্মনির্ভর প্রযুক্তি ব্যবস্থা গড়ে তোলার অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে। বর্তমানে দেশটির বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও প্রযুক্তি কোম্পানি বিদেশি নির্ভরতা কমিয়ে সম্পূর্ণ দেশীয় চিপ ও অবকাঠামো ব্যবহার করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেল প্রশিক্ষণ ও পরিচালনা করছে, যা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় নতুন মাত্রা যোগ করছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা উন্নয়নের সাধারণত তিনটি ধাপ থাকে— প্রথম ধাপে বিপুল তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষা দেওয়া হয়, দ্বিতীয় ধাপে মানুষের নির্দেশনা অনুযায়ী মডেলের আচরণ উন্নত করা হয় এবং তৃতীয় ধাপে ব্যবহারিক প্রয়োগে প্রশ্নের উত্তর প্রদান বা বাস্তব কাজ সম্পাদন করা হয়। চীনের প্রতিষ্ঠানগুলো এখন এই তিনটি ধাপেই দেশীয় হার্ডওয়্যার ব্যবহারের মাধ্যমে সফলতা অর্জনের দাবি করছে।
চীনা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠান জিপিইউ সম্প্রতি তাদের ছবি তৈরির মডেল জিএলএম-ইমেজ উন্মুক্ত করেছে, যা হুয়াওয়ের এসেন্ড আটলাস ৮০০টি এ২ সার্ভার এবং এসেন্ড ৯১০ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রসেসরের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত হয়েছে হুয়াওয়ের নিজস্ব মাইন্ডস্পোর ডিপ লার্নিং কাঠামো, যা বিদেশি সফটওয়্যারের বিকল্প হিসেবে কাজ করছে। অন্যদিকে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মেইতুয়ান তাদের বৃহৎ মডেল লংক্যাট ২.০ প্রিভিউ সম্পূর্ণ দেশীয় কম্পিউটিং অবকাঠামোর মাধ্যমে প্রশিক্ষণ ও পরিচালনা করেছে বলে জানিয়েছে, যেখানে প্রায় ৫০,০০০ থেকে ৬০,০০০ দেশীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চিপ ব্যবহার করা হয়েছে। যদিও নির্দিষ্ট চিপের ধরন প্রকাশ করা হয়নি, এটি দেশীয় সক্ষমতার একটি বড় উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এছাড়া গবেষণা প্রতিষ্ঠান মডেলবেস্ট বিটসিপিএম সিএএনএন নামে একটি হালকা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেল উন্মুক্ত করেছে, যেখানে সিএএনএন নামটি হুয়াওয়ের কম্পিউট আর্কিটেকচার ফর নিউরাল নেটওয়ার্ক থেকে এসেছে, যা এনভিডিয়ার কুডা প্ল্যাটফর্মের বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তাদের ছোট আকারের মডেল মিনি সিপিএম ৫–১বি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উচ্চ বুদ্ধিমত্তা সূচক অর্জন করে কয়েকটি শীর্ষ মডেলকেও ছাড়িয়ে গেছে বলে দাবি করা হয়েছে। একইভাবে আলোচিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠান ডিপসিক তাদের ১.৬ ট্রিলিয়ন প্যারামিটারের বৃহৎ মডেলের পোস্ট ট্রেনিংয়ে হুয়াওয়ের এসেন্ড ৯১০সি চিপ ব্যবহার করেছে এবং অন্তত ১,০০০ চিপের ক্লাস্টারের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেছে বলে জানা যায়। পাশাপাশি পিকিং বিশ্ববিদ্যালয় বাস্তব জগতের ভৌত পরিবেশ অনুকরণে সক্ষম উন্নত মডেল প্রকাশ করেছে, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে শীর্ষ অবস্থান অর্জন করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে বিদেশি চিপ ও সফটওয়্যারের আধিপত্য থাকলেও এখন চীন নিজস্ব চিপ, সফটওয়্যার ও অবকাঠামো গড়ে তুলে একটি পূর্ণাঙ্গ দেশীয় প্রযুক্তি ইকোসিস্টেম তৈরি করছে, যা ভবিষ্যতে বৈশ্বিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিযোগিতায় বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
