গত দুই দশকে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে বিপুল ঋণ, অবকাঠামো নির্মাণ এবং জ্বালানি খাতে আগ্রাসী বিনিয়োগের মাধ্যমে চীন মহাদেশটিতে নিজেদের প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু অর্থনৈতিক কার্যক্রম নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি ভূরাজনৈতিক কৌশলের অংশ। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অনিশ্চিত আফ্রিকা নীতি, সীমিত অর্থনৈতিক অঙ্গীকার এবং দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক পরিকল্পনার দুর্বলতার কারণে ওয়াশিংটনের প্রভাব ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। ফলে আফ্রিকার অর্থনীতি, জ্বালানি ও কৌশলগত খনিজ সম্পদের ওপর বেইজিংয়ের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছে।
বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, দুই হাজার সালের পর থেকে চীন আফ্রিকার বহু দেশে বিপুল পরিমাণ ঋণ দিয়েছে, যার বড় অংশ জ্বালানি ও অবকাঠামো খাতে ব্যয় হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন, তেল শোধনাগার, গ্যাস, জলবিদ্যুৎ, সৌরশক্তি এবং বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থায় চীনা অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত অংশগ্রহণ দ্রুত বেড়েছে। একই সঙ্গে আফ্রিকার গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ যেমন তামা, কোবাল্ট ও বক্সাইটে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে চীন অবকাঠামোর বিনিময়ে সম্পদ আহরণের নীতি অনুসরণ করছে। এই ব্যবস্থায় রাস্তা, হাসপাতাল, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও শিল্প অবকাঠামো নির্মাণের বিনিময়ে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘমেয়াদে খনিজ সম্পদ উত্তোলনের সুযোগ পাচ্ছে।
আফ্রিকার সবচেয়ে বড় চীনা ঋণগ্রহীতা দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে অ্যাঙ্গোলা, দক্ষিণ আফ্রিকা, সুদান, ইথিওপিয়া ও জাম্বিয়া। এসব দেশে তেল, বিদ্যুৎ, খনিশিল্প ও পরিবহন অবকাঠামো উন্নয়নে চীনের অর্থায়ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। অনেক আফ্রিকান সরকার মনে করে, পশ্চিমা দেশগুলোর তুলনায় চীন দ্রুত অর্থায়ন ও অবকাঠামো নির্মাণে বেশি কার্যকর। তবে সমালোচকদের মতে, অতিরিক্ত ঋণনির্ভরতা ভবিষ্যতে এসব দেশকে অর্থনৈতিকভাবে বেইজিংয়ের ওপর নির্ভরশীল করে তুলতে পারে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের আফ্রিকা নীতিতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্পষ্ট অনিশ্চয়তা দেখা গেছে। আফ্রিকান দেশগুলোর জন্য দেওয়া বাণিজ্য সুবিধার মেয়াদ স্বল্প সময়ের জন্য বাড়ানো এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে অনাগ্রহ আফ্রিকান অর্থনীতিতে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র যখন ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক উপস্থিতি কমাচ্ছে, তখন চীন সেই শূন্যস্থান দ্রুত পূরণ করছে। এর ফলে আফ্রিকার বহু দেশ এখন অবকাঠামো, জ্বালানি ও শিল্প উন্নয়নের ক্ষেত্রে বেইজিংকেই প্রধান অংশীদার হিসেবে দেখছে।
পরিশেষে বলা যায়, আফ্রিকায় চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার আড়ালে চীন কৌশলগত সম্পদ ও রাজনৈতিক প্রভাব বাড়াচ্ছে, আর যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে সেই প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে। ভবিষ্যতে আফ্রিকার ভূরাজনীতি ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে এই পরিবর্তনের প্রভাব আরও গভীর হতে পারে।
