চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলায় দুস্থ ও অসহায় মানুষের জন্য পরিচালিত খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আদলে ভুয়া কার্ড তৈরি করে প্রায় ১০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে এক চাঞ্চল্যকর ঘটনার উদ্ভব হয়েছে, যা স্থানীয়ভাবে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। ধাইনগর ইউনিয়নের বাসিন্দা জেসমিন বেগম ‘মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ, ক্ষুধা হবে নিরুদ্দেশ’ এই স্লোগান ব্যবহার করে ‘মাসকুরা ট্রেডার্স’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন এবং ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে তার কার্যক্রম শুরু করেন। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি খাদ্য সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রায় ২০ হাজার মানুষের কাছ থেকে প্রতিটি কার্ডের জন্য ৫ হাজার টাকা করে আদায় করেন, যার মোট পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১০ কোটি টাকা। পাশাপাশি ৩০ কেজি চাল দেওয়ার কথা বলে অতিরিক্ত ৫০০ টাকা করে নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, এই পুরো প্রক্রিয়ায় প্রকৃত সুবিধাভোগীদের বঞ্চিত করে ভুয়া তালিকা তৈরি এবং প্রতারণামূলক কৌশলের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছে, যা দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে।
এই ঘটনার পর ধাইনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন এবং দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। তিনি জানান, বিষয়টি জানার পর জেসমিন বেগমের ট্রেড লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে এবং গত ৬ এপ্রিল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ জমা দেওয়া হয়েছে। অভিযোগের ভিত্তিতে উপজেলা প্রশাসন প্রাথমিক তদন্ত পরিচালনা করে এবং জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত চলাকালে সহকারী কমিশনারের কার্যালয়ে ডাকা হলে জেসমিন বেগম বিপুল সংখ্যক নারীকে নিয়ে উপস্থিত হয়ে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেন এবং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানকে প্রায় এক ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখার অভিযোগ ওঠে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের প্রতারণা কেবল আর্থিক ক্ষতিই নয়, বরং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করে। অভিযোগ রয়েছে, এই ঘটনার সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ের কিছু অসাধু ব্যক্তি ও প্রভাবশালী চক্র জড়িত থাকতে পারে, যা সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে উদ্ঘাটন করা জরুরি। এই অর্থ আত্মসাতের ফলে বহু দরিদ্র পরিবার তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে, যা গ্রামীণ অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে এবং সামাজিক বৈষম্য আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। তাই দোষীদের দ্রুত চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা, আত্মসাৎকৃত অর্থ উদ্ধার করে প্রকৃত সুবিধাভোগীদের মাঝে ফিরিয়ে দেওয়া এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা প্রতিরোধে কঠোর তদারকি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত প্রয়োজন। অসহায় মানুষের দুরবস্থাকে পুঁজি করে যারা এ ধরনের জালিয়াতিতে লিপ্ত হয়, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণই সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার একমাত্র পথ হতে পারে।
