বাংলাদেশে নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতা, ধর্ষণ এবং নির্যাতনের ঘটনা সাম্প্রতিক সময়ে উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা এখন একটি গভীর সামাজিক ও মানবিক সংকটে পরিণত হয়েছে। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২০ মে পর্যন্ত দেশে অন্তত ১১৮ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছেন এবং ৪৬ জন ধর্ষণচেষ্টার ঘটনার মুখোমুখি হয়েছেন। একই সময়ে ধর্ষণের পর ১৪ জনকে হত্যা করা হয়েছে, ধর্ষণচেষ্টার পর হত্যা করা হয়েছে ৩ জনকে এবং সামাজিক অপমান ও মানসিক চাপ সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করেছেন ২ জন ভুক্তভোগী। সব মিলিয়ে মাত্র চার মাসে দেশে ২২৪টি ধর্ষণ মামলা নথিভুক্ত হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিবেদনও দেখাচ্ছে যে নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার প্রবণতা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরীদের বিরুদ্ধে অপরাধের সংখ্যা বেশি হওয়ায় বিষয়টি আরও ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরে দেশে কয়েক হাজার ধর্ষণ মামলা দায়ের হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় অনেক বেশি। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকৃত সংখ্যা আরও বড় হতে পারে, কারণ সামাজিক লজ্জা, ভয় এবং বিচার না পাওয়ার আশঙ্কায় বহু পরিবার অভিযোগই করে না।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতির পেছনে শুধু আইনশৃঙ্খলার দুর্বলতা নয়, বরং সমাজের গভীর মানসিক ও নৈতিক সংকটও দায়ী। পরিবারে সচেতনতার অভাব, মাদকাসক্তি, ক্ষমতার অপব্যবহার, অনলাইনে সহিংস ও নারী বিদ্বেষমূলক কনটেন্টের বিস্তার এবং পর্নোগ্রাফির সহজলভ্যতা তরুণদের মানসিকতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। একই সঙ্গে দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি অপরাধীদের মধ্যে ভয় কমিয়ে দিচ্ছে।
মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, শুধু কঠোর আইন করলেই এই সংকটের সমাধান হবে না। দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা, নারী ও শিশুবান্ধব তদন্তব্যবস্থা গড়ে তোলা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তা জোরদার করা এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এখন অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি ভুক্তভোগীকে দোষারোপ করার সামাজিক প্রবণতা বন্ধ না হলে অনেক অপরাধই আড়ালে থেকে যাবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিচয় বিবেচনা না করে দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করতে পারলেই কেবল সমাজে আস্থা ফিরবে এবং নারী ও শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ পরিবেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
