বাংলাদেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ খাতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে। ১৮ জুন ২০২৬ তারিখে সরকার দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী কক্সবাজারের মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর এলাকা এবং চট্টগ্রাম বন্দরের নিকটবর্তী স্থানে মোট প্রায় ৬০০ একর জমির ওপর ২টি মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল গড়ে তোলা হবে। এর মধ্যে মাতারবাড়ি এলাকায় প্রায় ৩০০ একর জমিতে একটি অঞ্চল স্থাপনের প্রাথমিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত অনুমোদিত হয়। সরকারের মতে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ, বন্দরভিত্তিক শিল্পায়ন এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করাই এই উদ্যোগের প্রধান লক্ষ্য। মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল এমন একটি বিশেষ অর্থনৈতিক এলাকা, যেখানে আমদানি, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, পুনঃরপ্তানি এবং পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে শুল্ক ও প্রশাসনিক বিধিনিষেধ তুলনামূলকভাবে শিথিল থাকে। ফলে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সহজে ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারেন।
মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দরকে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। জাপানের সহযোগিতায় নির্মাণাধীন এই বন্দর সম্পূর্ণরূপে চালু হলে বৃহৎ আন্তর্জাতিক জাহাজ সরাসরি বাংলাদেশে নোঙর করতে পারবে। বর্তমানে অনেক পণ্য বিদেশি বন্দরের মাধ্যমে স্থানান্তর করতে হয়, যার ফলে সময় ও ব্যয় উভয়ই বৃদ্ধি পায়। মাতারবাড়ি কার্যকরভাবে চালু হলে এই নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গতি আরও ত্বরান্বিত হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল প্রতিষ্ঠিত হলে বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে, নতুন শিল্পকারখানা গড়ে উঠবে, হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং রপ্তানি আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। পাশাপাশি বাংলাদেশ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ পণ্য পরিবহন, বিতরণ ও পুনঃরপ্তানি কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারবে। বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোও আঞ্চলিক সরবরাহ ও বাণিজ্য পরিচালনার জন্য বাংলাদেশকে কৌশলগত কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করতে পারে।
তবে সরকার জানিয়েছে, প্রকল্পটি বর্তমানে ধারণাগত পর্যায়ে রয়েছে। নীতিগত অনুমোদনের পর সম্ভাব্যতা যাচাই, অবকাঠামোগত পরিকল্পনা, বিনিয়োগ কাঠামো এবং পরিচালন পদ্ধতি চূড়ান্ত করা হবে। সফল বাস্তবায়নের মাধ্যমে মাতারবাড়ি ও চট্টগ্রামকে ঘিরে গড়ে উঠতে পারে একটি আধুনিক বাণিজ্যিক বলয়, যা বাংলাদেশের অর্থনীতি, শিল্পায়ন, রপ্তানি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নতুন গতি সঞ্চার করবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য ও পরিবহন কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার পথও আরও সুদৃঢ় হবে।
