দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে দ্রুত পরিবর্তনশীল বাস্তবতা নতুন কৌশলগত আলোচনার জন্ম দিচ্ছে, যেখানে বাংলাদেশ–চীন–পাকিস্তানের ক্রমবর্ধমান যোগাযোগকে ঘিরে ভারতের উদ্বেগ প্রকাশ্যে এসেছে। ভারতের সাবেক শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা রাকেশ আস্থানা এক বিশ্লেষণে উল্লেখ করেছেন, দেশটি বর্তমানে পশ্চিম, উত্তর ও পূর্ব—এই ৩ দিক থেকেই সম্ভাব্য কৌশলগত চাপ অনুভব করছে। তার মতে, দীর্ঘদিন ধরে চলমান ভারত–চীন সীমান্ত উত্তেজনা এখন নতুন মাত্রা পাচ্ছে আঞ্চলিক কূটনৈতিক ও সামরিক সম্পর্কের পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে।
ভারতের উত্তর সীমান্তে লাদাখ, অরুণাচল প্রদেশ ও উত্তরাখণ্ড অঞ্চলে চীনের অবকাঠামোগত সক্ষমতা বৃদ্ধিকে দিল্লি দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে। এ প্রেক্ষাপটে ভারত সীমান্তবর্তী অঞ্চলে নতুন সড়ক, হেলিপ্যাড, অবতরণ ক্ষেত্র এবং দ্বৈত ব্যবহারযোগ্য অবকাঠামো নির্মাণে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। পাশাপাশি ‘ভাইব্রেন্ট ভিলেজেস’ কর্মসূচির মাধ্যমে সীমান্ত এলাকার জনসংখ্যা ধরে রাখা এবং স্থানীয় অর্থনীতি সক্রিয় করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে ভারতীয় বিশ্লেষকদের মতে, নতুন উদ্বেগের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক ও প্রতিরক্ষা যোগাযোগ। কয়েক দশকের মধ্যে প্রথমবার পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থার উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের ঢাকা সফর এবং কৌশলগত কিছু এলাকা পরিদর্শনের খবর দিল্লির নিরাপত্তা মহলে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একই সময়ে পাকিস্তানের আয়োজিত বহুজাতিক নৌ-মহড়া ‘আমান’-এ বাংলাদেশের অংশগ্রহণকেও ভারত আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা সম্পর্কের নতুন ইঙ্গিত হিসেবে দেখছে।
আরেকটি আলোচিত বিষয় হলো সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা সহযোগিতা। কিছু বিশ্লেষকের ধারণা, ভবিষ্যতে বাংলাদেশ যদি চীন–পাকিস্তান যৌথ উদ্যোগে তৈরি সামরিক প্রযুক্তি বা যুদ্ধবিমান সংগ্রহে আগ্রহ দেখায়, তাহলে দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত ভারসাম্যে নতুন প্রভাব পড়তে পারে। যদিও এ ধরনের সম্ভাবনা নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত প্রকাশিত হয়নি।
অন্যদিকে বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করেন, প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে সম্পর্ক বৃদ্ধি সবসময় নিরাপত্তা প্রতিযোগিতার ইঙ্গিত নয়; বরং অর্থনীতি, বাণিজ্য, অবকাঠামো ও আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিকে কেবল প্রতিদ্বন্দ্বিতার দৃষ্টিতে নয়, বরং পরিবর্তিত আঞ্চলিক বাস্তবতা ও বহুমাত্রিক কূটনৈতিক সম্পর্কের অংশ হিসেবেও মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। আগামী কয়েক বছরে বাংলাদেশ, ভারত, চীন ও পাকিস্তানের পারস্পরিক অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও কৌশলগত ভারসাম্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
