বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে বর্তমানে মূলধন ঘাটতির সংকট একটি গুরুতর আর্থিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে এসেছে, যেখানে প্রাপ্ত সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী প্রায় ২০টি ব্যাংকে পর্যাপ্ত মূলধন না থাকার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, যা সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। বিশেষ করে কয়েকটি বেসরকারি, রাষ্ট্রায়ত্ত ও ইসলামী ব্যাংকে বড় অঙ্কের মূলধন ঘাটতি দেখা যাচ্ছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক এবং রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক ও বেসিক ব্যাংক।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী ব্যাংকগুলোর মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী সাধারণত ১০–১২.৫ শতাংশের মধ্যে থাকা প্রয়োজন হলেও সাম্প্রতিক সামষ্টিক অবস্থায় অনেক ব্যাংকের এই হার উল্লেখযোগ্যভাবে নিচে নেমে গেছে, যা আর্থিক ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। এই ঘাটতির পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে বেড়ে চলা অনাদায়ী ঋণ, দুর্বল ঋণ ব্যবস্থাপনা, রাজনৈতিক প্রভাবিত ঋণ বিতরণ এবং কর্পোরেট গভর্নেন্সের ঘাটতি চিহ্নিত করা হয়েছে। এছাড়া ঋণ পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠন নীতির অতিরিক্ত ব্যবহার প্রকৃত ক্ষতির চিত্র আড়াল করেছে, যার ফলে ব্যাংকগুলোর প্রকৃত আর্থিক অবস্থার সঠিক প্রতিফলন পাওয়া যায়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, কিছু ব্যাংকের ক্ষেত্রে মূলধন ঘাটতির পরিমাণ কয়েক হাজার কোটি টাকা থেকে শুরু করে দশ হাজার কোটি টাকারও বেশি পর্যন্ত পৌঁছেছে, যা পরিস্থিতির গভীরতা নির্দেশ করে। এই অবস্থায় ব্যাংকগুলো নতুন ঋণ বিতরণে সীমাবদ্ধতার মুখে পড়তে পারে, ফলে বিনিয়োগ প্রবাহ ধীর হয়ে যেতে পারে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ঋণমান নির্ধারণকারী সংস্থাগুলোর আস্থা হ্রাস পাওয়ার কারণে বৈদেশিক বিনিয়োগ প্রবাহেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, যদি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হয়, তাহলে ব্যাংকিং খাতে আস্থা সংকট আরও গভীর হতে পারে, যা পুরো অর্থনীতিকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলবে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি ব্যবস্থা জোরদার করা, অনাদায়ী ঋণ আদায়ে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ, স্বচ্ছ আর্থিক প্রতিবেদন নিশ্চিত করা, দুর্বল ব্যাংক পুনর্গঠন বা একীভূতকরণ এবং সুশাসন শক্তিশালী করা অত্যন্ত জরুরি বলে বিশেষজ্ঞরা মত দিয়েছেন। পাশাপাশি ঝুঁকি ভিত্তিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা উন্নত করা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নজরদারি আরও কার্যকর করা হলে ব্যাংকিং খাত ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতার দিকে ফিরতে পারে।
