সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের জমা অর্থ গত এক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশের অর্থনীতি, বৈদেশিক অর্থপ্রবাহ এবং আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ২০২৫ সালের প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশটির ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশি ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংকসমূহের মোট আমানত দাঁড়িয়েছে ৮৩৪.১ মিলিয়ন সুইস ফ্রাঁ, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় আনুমানিক ১২,৭০০ কোটিরও বেশি। এর আগের বছর ২০২৪ সালে এই পরিমাণ ছিল প্রায় ৫৯০ মিলিয়ন সুইস ফ্রাঁ। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে আমানত বেড়েছে প্রায় ৪১ শতাংশ। এই বৃদ্ধি ২০২১ সালের ৮৭১.১ মিলিয়ন সুইস ফ্রাঁর রেকর্ডের খুব কাছাকাছি অবস্থানে পৌঁছেছে এবং গত এক দশকের মধ্যে এটিকে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মাত্রা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে এই বৃদ্ধির পেছনের গঠন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পুরো চিত্রটি ব্যক্তিগত আমানতের নয়। বরং সবচেয়ে বড় অবদান এসেছে বাংলাদেশি ব্যাংকগুলোর আমানত বৃদ্ধির মাধ্যমে। তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশি ব্যাংকগুলোর জমা অর্থ ছিল ৫৭৬.৬ মিলিয়ন সুইস ফ্রাঁ, যা ২০২৫ সালে বেড়ে ৮২২.৭ মিলিয়ন সুইস ফ্রাঁতে পৌঁছেছে। অর্থাৎ মোট আমানতের প্রায় ৯৮.৬ শতাংশই এসেছে ব্যাংকিং খাত থেকে। অন্যদিকে ব্যক্তিগত হিসাবে রাখা অর্থ সামান্য কমে ১২.৬ মিলিয়ন থেকে ১১.৪ মিলিয়ন সুইস ফ্রাঁ হয়েছে। ফলে সামগ্রিক বৃদ্ধিকে সরাসরি ব্যক্তিগত সম্পদ স্থানান্তর হিসেবে ব্যাখ্যা করা যথেষ্ট নয়।
বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে অর্থপাচার নিয়ে জনআলোচনা থাকায় সুইস ব্যাংকে অর্থ বৃদ্ধির তথ্য নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। তবে অর্থনীতিবিদরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, বর্তমান সময়ে সুইজারল্যান্ড আগের মতো সম্পূর্ণ গোপন আর্থিক ব্যবস্থার দেশ নয়। আন্তর্জাতিক তথ্য বিনিময় ব্যবস্থা, আর্থিক স্বচ্ছতা নীতি এবং অর্থপাচারবিরোধী সমঝোতার মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের সরকার প্রয়োজনে তথ্য সংগ্রহের সুযোগ পায়। ফলে সুইস ব্যাংকে অর্থ থাকা মানেই তা অবৈধ—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোও সঠিক নয়।
একই সময়ে আন্তর্জাতিক তুলনায় দেখা গেছে, ভারতীয় গ্রাহকদের সুইস ব্যাংকে থাকা মোট অর্থ প্রায় ৮ শতাংশ কমেছে, কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে উল্টো প্রবণতা দেখা গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই তথ্য দেশের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা, আর্থিক প্রবাহ, বিনিয়োগ পরিবেশ এবং অবৈধ অর্থ স্থানান্তর প্রতিরোধ নীতির কার্যকারিতা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত হবে। ভবিষ্যতে এই প্রবণতার প্রকৃত কারণ বিশ্লেষণ এবং স্বচ্ছ ব্যাখ্যা দেওয়া অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণের জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
