বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আগামী ২৩–২৬ জুন চীন সফরকে ঘিরে দুই দেশের অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক, জ্বালানি ও অবকাঠামোগত সহযোগিতায় নতুন গতি সৃষ্টির প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। এই সফরের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন বৃদ্ধি, বৈদ্যুতিক যানবাহন শিল্পের বিকাশ এবং আধুনিক প্রযুক্তি স্থানান্তরের মাধ্যমে দেশের শিল্প ও জ্বালানি খাতকে আরও শক্তিশালী করা। সফরকালে দুই দেশের মধ্যে একাধিক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের সম্ভাবনা রয়েছে, যা ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সম্পর্কের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশ ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম অঞ্চলে প্রস্তাবিত চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। এই অঞ্চলের উন্নয়নকারী হিসেবে চীনের একটি বৃহৎ অবকাঠামো নির্মাণ প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, ভূমি উন্নয়নের পর এই অর্থনৈতিক অঞ্চলে বাংলাদেশের অংশীদারিত্ব হবে ৩০% এবং চীনের অংশীদারিত্ব হবে ৭০%। সরকারের মতে, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বিপুল বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট হবে, রপ্তানিমুখী শিল্প সম্প্রসারিত হবে এবং হাজার হাজার নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
সফরকে কেন্দ্র করে বেইজিংয়ে একটি বৃহৎ বিনিয়োগ সম্মেলনেরও প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে, যেখানে সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বৈদ্যুতিক যানবাহন, সবুজ প্রযুক্তি এবং গবেষণা সহযোগিতার ক্ষেত্রেও যৌথ উদ্যোগ গ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে। বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার এবং পরিবেশবান্ধব অর্থনীতি গঠনের লক্ষ্যে এই খাতগুলোকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এছাড়া দুই দেশের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি, মুদ্রা অদল-বদল ব্যবস্থা, বিনিয়োগ চুক্তির আধুনিকায়ন এবং একটি চীনা ব্যাংক প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাও আলোচনায় রয়েছে। বাংলাদেশ আঞ্চলিক আর্থিক ও অর্থনৈতিক বিভিন্ন উদ্যোগে অংশগ্রহণের বিষয়ও বিবেচনা করছে, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও আর্থিক সহযোগিতা সম্প্রসারণে সহায়ক হতে পারে।
স্বাস্থ্য খাতেও সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নীলফামারীতে ১,০০০ শয্যাবিশিষ্ট বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার জন্য একটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষরের সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি মোংলা বন্দরের সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন, তিস্তা ব্যারেজ, প্রস্তাবিত পদ্মা ব্যারেজ, দ্বিতীয় পদ্মা সেতু এবং দ্বিতীয় যমুনা সেতুসহ একাধিক বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পের জন্য চীনা অর্থায়ন চাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
বর্তমানে চীনের ঋণ সহায়তায় প্রায় ৪০০ কোটি ডলার মূল্যের ৫টি বড় প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। এসব প্রকল্পের দ্রুত অর্থছাড় ও বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করাও সফরের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য। সামগ্রিকভাবে এই সফর কেবল বিনিয়োগ আকর্ষণের সুযোগই নয়, বরং শিল্পায়ন, জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, অবকাঠামো সম্প্রসারণ এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার একটি কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
