বান্দরবানের আলীকদম–থানচি সীমান্তবর্তী দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে সংঘটিত প্রাকৃতিক বন উজাড় ও কাঠ পাচারের কারণে ভয়াবহ পরিবেশগত সংকট সৃষ্টি হয়েছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, একটি সংঘবদ্ধ চক্র পাহাড় কেটে রাস্তা তৈরি, নির্বিচারে শতবর্ষী মাতৃগাছ নিধন এবং ঝিরির স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বন্ধ করে পুরো এলাকার পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে। প্রায় দুই শত একর বনভূমি জুড়ে চলমান এই ধ্বংসযজ্ঞে গর্জন, চাম্পা, কড়ই, বৈলাম, গুটগুটিয়া, লালী ও চাপালিশসহ বহু মূল্যবান প্রজাতির গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। এর ফলে একসময় প্রাণবন্ত এই বনভূমি এখন প্রায় বৃক্ষশূন্য হয়ে পড়েছে।
স্থানীয়রা জানান, পাহাড় কেটে ভারী যান চলাচলের উপযোগী রাস্তা নির্মাণের পাশাপাশি ঝিরির স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, যার কারণে ব্যাঙ ঝিরিসহ একাধিক পানির উৎস শুকিয়ে গেছে। এই ঝিরির পানির ওপর নির্ভরশীল অন্তত পাঁচটি পাড়ার ম্রো জনগোষ্ঠী এখন চরম পানিসংকটে দিন কাটাচ্ছে। একসময় যেখানে হরিণ, ভালুক, বন্যশূকরসহ নানা প্রজাতির বন্যপ্রাণীর বিচরণ ছিল, সেখানে এখন আর প্রাণের কোনো চিহ্ন নেই বলে স্থানীয়রা জানান। বন উজাড়ের ফলে শুধু পানির উৎসই নয়, পুরো জীববৈচিত্র্যই মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, কাটা গাছের একটি অংশ বন বিভাগের অনুমতিপত্র দেখিয়ে বৈধতার আড়ালে দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাচার করা হচ্ছে, আর বাকি অংশ অবৈধ ইটভাটায় জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। একইসঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়িয়ে বাইপাস রাস্তা ব্যবহার করে কাঠ পাচারের অভিযোগও পাওয়া গেছে। ফলে পাহাড়ি এই অঞ্চলটি ধীরে ধীরে পরিবেশগত বিপর্যয়ের দিকে ধাবিত হচ্ছে।
পরিবেশবিদদের মতে, নির্বিচারে বন ধ্বংসের ফলে মাটির পানি ধারণক্ষমতা কমে গেছে, বৃষ্টির পানি ভূগর্ভে প্রবেশ না করে দ্রুত প্রবাহিত হয়ে যাচ্ছে, যা ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ পানিসংকট তৈরি করবে। পাহাড়ি ঝরনা ও ছড়াগুলো শুকিয়ে যাওয়ায় ইতোমধ্যেই এলাকায় সুপেয় পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। এভাবে বন উজাড় চলতে থাকলে অদূর ভবিষ্যতে এই অঞ্চল মরুকরণের ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
স্থানীয় প্রশাসন ও বন বিভাগের পক্ষ থেকে বিষয়টি তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে কার্যকর পদক্ষেপের অভাব নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, অবিলম্বে অবৈধ বন নিধন বন্ধ, পাহাড় রক্ষা এবং ব্যাপক বনায়ন কর্মসূচি গ্রহণ ছাড়া এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়। প্রকৃতিকে রক্ষা করা না গেলে এই অঞ্চলে মানবজীবন ও পরিবেশ উভয়ই চরম হুমকির মুখে পড়বে।
